রাত জেগে ফোন ব্যবহারে কিশোরদের ঘুম কমছে, বাড়ছে মানসিক সমস্যা
রাত জেগে ফোন ব্যবহারে কিশোরদের ঘুম কমছে, বাড়ছে মানসিক সমস্যা

পড়াশোনা আর বাড়ন্ত বয়সের কারণে কিশোর-কিশোরীদের যখন সবচেয়ে বেশি ঘুমের প্রয়োজন, ঠিক তখনই স্কুল খোলার দিনগুলোতেও গভীর রাত পর্যন্ত মুঠোফোনের স্ক্রিনে আটকে থাকছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস এবং অ্যাকাডেমি অব স্লিপ মেডিসিন কিশোর-কিশোরীদের প্রতি রাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেয়। তবে নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকেরও বেশি কিশোর-কিশোরী স্কুল খোলার দিনগুলোতে রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় মুঠোফোনে ব্যয় করছে।

গবেষণায় কী পাওয়া গেছে

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার পেডিয়াট্রিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং গবেষণার প্রধান লেখক জেসন এম নাগাতা জানান, কিশোর-কিশোরীদের অর্ধেকেরও বেশি মধ্যরাতে (১২টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে) ফোন ব্যবহার করে। অ্যাডোলসেন্ট ব্রেন কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট স্টাডি’র তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, কীভাবে রাতের ফোন ব্যবহারের ধরণ কিশোর-কিশোরীদের ঘুমের সময় কমিয়ে দিচ্ছে। এই গবেষণায় রাতের ফোন ব্যবহারের সঙ্গে সরাসরি কোনও ক্ষতির যোগসূত্র না দেখানো হলেও, পূর্ববর্তী বিভিন্ন গবেষণায় ঘুমের ব্যাঘাতের নেতিবাচক প্রভাব প্রমাণিত হয়েছে।

ঘুমের অভাবের প্রভাব

এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত না থাকা ব্রাউন ইউনিভার্সিটির মনোরোগ ও মানব আচরণ বিষয়ের অধ্যাপক ড. মেরি এ কার্সকাডন বলেন, ‘ঘুমের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার কারণে কিশোর-কিশোরীদের পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে না, যা তাদের জেগে থাকার সময়ের আচরণে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’ ঘুমের অভাব কিশোর-কিশোরীদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়, যার ফলে সারাদিনের শেখা তথ্যগুলো মনে রাখা বা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অধ্যাপক কার্সকাডন বলেন, ‘কিশোর বয়সের অন্যতম প্রধান কাজ হলো শেখা, তা স্কুলের পড়াশোনা হোক, খেলাধুলা হোক বা সামাজিক মেলামেশা।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০১৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের যখন টানা এক সপ্তাহ মাত্র সাড়ে ৬ ঘণ্টা ঘুমাতে দেওয়া হয়, তখন তাদের মধ্যে উদ্বেগ, রাগ, বিভ্রান্তি, ক্লান্তি ও খিটখিটে মেজাজ অনেক বেড়ে যায়। নাগাতা ও কার্সকাডন আরও জানান, ঘুমের অভাব মানসিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে। এর ফলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যার চিন্তা, নিজের ক্ষতি করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

কোন অ্যাপে বেশি সময় কাটায় কিশোররা

গবেষণায় দেখা গেছে, কিশোর-কিশোরীরা মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিনোদন, গেম ও গানের অ্যাপে বেশি সময় কাটায়। তারা প্রতি রাতে গড়ে সর্বোচ্চ ৩৩ মিনিট সময় ব্যয় করে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো অ্যাপগুলোতে। এ বিষয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর পক্ষ জানতে চাওয়া হলে ইউটিউব তাদের ওয়েবসাইটে থাকা প্যারেন্টাল কন্ট্রোল (অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ) সংক্রান্ত লিংক পাঠায়, তবে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনও মন্তব্য করেনি। অধ্যাপক কার্সকাডন বলেন, এই অ্যাপগুলোতে ব্যবহারকারীদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতে হয়, যা মস্তিষ্কের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয় এবং ঘুম আসা কঠিন করে তোলে। তা ছাড়া রাতের বেলা ফোনের আলো, রিংটোন বা নোটিফিকেশনের শব্দ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়।

রাতে ফোন ব্যবহারের অন্যান্য দিক

নাগাতার ২০২৩ সালের অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৭ শতাংশ কিশোর-কিশোরী রাতে অন্তত একবার ফোন কল, মেসেজ বা ইমেইলের শব্দে জেগে ওঠে এবং ২০ শতাংশ রাতে ঘুম ভাঙার পর ফোন ব্যবহার করে। এই সমস্যা সমাধানে নাগাতা ও কার্সকাডন অভিভাবকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, সুস্থ স্ক্রিন টাইম বা ফোন ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে মা-বাবাকেই রোল মডেল হতে হবে। কারণ দেখা গেছে, কিশোর-কিশোরীদের ফোন ব্যবহারের অন্যতম বড় কারণ হলো তাদের মা-বাবার ফোন ব্যবহারের অভ্যাস।

সমাধানের পথ

আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস পুরো পরিবারের জন্য একটি ফ্যামিলি মিডিয়া প্ল্যান তৈরির পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, বাড়িতে ফোনবিহীন নির্দিষ্ট স্থান ও সময় নির্ধারণ করা, ফোন ব্যবহারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং ডিভাইস ছাড়া অন্যান্য কার্যক্রমের পরিকল্পনা করা। শোবার ঘরে ফোন না রাখা এবং প্রয়োজনে একটি পারিবারিক বাক্স ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, যেখানে সবাই রাতে ফোন লক করে রাখবে। সূত্র: সিএনএন