বাউফলে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের তীব্র প্রতিবাদ, ধর্মঘটে উত্তাল এলাকা
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। বিএনপি নেতার ছেলেসহ কয়েকজনের চাঁদাবাজি বন্ধ করে দেওয়ায় দুই ব্যবসায়ীকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার সকালে দোকান বন্ধ করে ধর্মঘট শুরু করেন ব্যবসায়ীরা।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
শুক্রবার সকালে বাউফল উপজেলার কালাইয়া ধান হাট সেতুর পশ্চিম পাশে দাসপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দাসপাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সোহরাব হোসেন প্যাদার ছেলে মো. শান্ত প্যাদাসহ কয়েকজন নিয়মিত তাঁদের দোকান থেকে চাঁদা নিতেন।
গত বুধবার থেকে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দিলে নির্মাণসামগ্রী মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করলে আজ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানাকে ডেকে নিয়ে ধারালো ছুরি বের করে তাঁকেও হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ।
ধর্মঘট ও সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ
একপর্যায়ে স্থানীয় লোকজন ও ব্যবসায়ীদের তোপের মুখে অভিযুক্তরা পালিয়ে যান। পরে ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে ধর্মঘট শুরু করেন। ধর্মঘটের খবর পেয়ে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
তিনি চাঁদাবাজি বন্ধসহ দ্রুত ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিলে ব্যবসায়ীরা দোকান খুলতে রাজি হন। দুপুর ১২টার দিকে দোকান খোলেন তারা।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দাসপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ৩২ জন ব্যবসায়ীর দোকান আছে। দাসপাড়া-কালাইয়া নির্মাণসামগ্রী মালিক সমিতির আওতায় তাঁরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রলার ও কার্গোতে করে রড, সিমেন্ট, বালু, পাথরসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী এনে ব্যবসা করেন।
প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি ট্রলার ও কার্গো সেখানে আসে। ওই বিএনপি নেতার ছেলেসহ কয়েকজন প্রতিটি ট্রলার ও কার্গো বাবদ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এক থেকে দেড় হাজার টাকা চাঁদা নিতেন। সেই চাঁদার টাকা বন্ধ করে দেওয়ায় হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
সমিতি নেতাদের প্রতিক্রিয়া
দাসপাড়া-কালাইয়া নির্মাণসামগ্রী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা বলেন, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বাউফলকে চাঁদাবাজমুক্ত করবেন। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর গত বুধবার সন্ধ্যায় ব্যবসায়ীরা জরুরি সভা করে সিদ্ধান্ত দেন, এখন থেকে তাঁরা আর চাঁদা দেবেন না।
শান্ত প্যাদা গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে চাঁদা নিতে এলে সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী অপারগতা প্রকাশ করেন। তখন তাঁকে প্রকাশ্যে তিন দিনের মধ্যে হত্যার হুমকি দেন শান্ত। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করার পর আজ সকালে মাসুদ রানাকে ডেকে নিয়ে ছুরি বের করে আবার হুমকি দেন।
সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘শান্তর কাছে সব সময় অস্ত্র থাকে। এ কারণে ভয়ের মধ্যে আছি।’ দ্রুত তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।
বিপক্ষের বক্তব্য ও প্রশাসনের অবস্থান
অভিযোগের বিষয়ে শান্ত প্যাদার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তাঁর বাবা বিএনপি নেতা সোহরাব হোসেন প্যাদা বলেন, ‘দাসপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলী আজম চৌধুরীর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে জলমহাল কিনেছেন। এ কারণে তাঁর ছেলে শান্ত ট্রলারপ্রতি ২০০ টাকা করে নেয়। এটা কোনো চাঁদাবাজি নয়।’
তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কালাইয়া ও দাসপাড়া খাল জলমহাল হিসেবে কাউকে ইজারা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে বিএনপি নেতা আলী আজমের মুঠোফোন নম্বর বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তাঁর আসনে কোনো চাঁদাবাজি চলবে না। ব্যবসায়ীরা অবশ্যই নির্বিঘ্নে ব্যবসা করবেন। প্রয়োজনে জীবন বাজি রেখে তিনি চাঁদাবাজমুক্ত বাউফল গড়বেন।’
পটুয়াখালীর সহকারী পুলিশ সুপার (বাউফল সার্কেল) আরিফ মুহাম্মদ শাকুর বলেন, ‘সংসদ সদস্য মহোদয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ওই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
