ডিএনসিসির ওয়েবসাইটে মৃত কর্মীর নাম, মশা নিধনে তালিকায় অসংগতি ও তদারকি ঘাটতি
ডিএনসিসির ওয়েবসাইটে মৃত কর্মীর নাম, মশা নিধনে অসংগতি

ডিএনসিসির ওয়েবসাইটে মৃত কর্মীর নাম, মশা নিধনে তালিকায় অসংগতি ও তদারকি ঘাটতি

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘মশক নিধন কর্মপরিকল্পনা’ তালিকায় মৃত কর্মীর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এবং নির্ধারিত সময়ে কর্মীরা অনুপস্থিত পাওয়া গেছে। তালিকায় ২ নম্বর ওয়ার্ডের (মিরপুর) কর্মীদের মধ্যে ৮ নম্বর নামটি মশা নিধন কর্মী অফর আলীর, যিনি প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার সাগুফতা আবাসিক এলাকার ১ থেকে ৫ নম্বর সড়ক ও বেগুনটিলা বস্তি এলাকায় কাজ করার কথা। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, কাজ শুরু হওয়ার কথা সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত।

কর্মী অনুপস্থিত, মৃতের নাম তালিকায়

গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে সাগুফতা এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজার পরও কোনো মশা নিধন কর্মীকে পাওয়া যায়নি। তালিকায় দেওয়া অফর আলীর মুঠোফোন নম্বরে কল করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে স্বপ্ননগর আবাসিক এলাকায় গিয়ে একটি ভবনের কাছে মশা নিধনকাজে নিয়োজিত এক কর্মী দেখা যায়, কিন্তু তিনি তখন ওষুধ ছিটাচ্ছিলেন না। কিছুক্ষণ পর তিনি মোটরসাইকেলে করে চলে যান।

ওই কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি ২ নম্বর ওয়ার্ডের মশক সুপারভাইজার রকিবুল আলম খান, এবং তাঁর সঙ্গী শাহ আলম। সাগুফতা এলাকায় অফর আলীকে না পাওয়ার বিষয়ে রকিবুল জানান, অফর আলী প্রায় আড়াই বছর আগে মারা গেছেন। তবে তাঁর নাম এখনো তালিকায় থাকার কারণ সম্পর্কে রকিবুল কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

ওয়েবসাইটে তথ্য হালনাগাদ হয়নি

ডিএনসিসি সূত্র জানায়, ওয়েবসাইটে দেওয়া ‘মশক নিধন কর্মপরিকল্পনা’ তালিকায় অনেক অসংগতি রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী স্বীকার করেন, ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনেক দিন হালনাগাদ করা হয়নি। তিনি বলেন, “বর্তমানে কিউলেক্স মশা বাড়ছে, এর বিস্তার মূলত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন জলাশয়, খাল-নালায় জমে থাকা নোংরা পানি মশার প্রজনন বাড়াচ্ছে। একটি খাল পরিষ্কার করলে অন্যটি আবার নোংরা হয়। শুধু ওষুধ ছিটিয়ে সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন কার্যকর ড্রেনেজ ও সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।”

বাসিন্দাদের অভিযোগ ও তদারকি ঘাটতি

মিরপুর ও উত্তরা এলাকার বাসিন্দারা মশার উপদ্রবের তীব্রতা সম্পর্কে অভিযোগ করেন। স্বপ্ননগরের বাসিন্দা আরাফাত হোসেন বলেন, “রাতে মশার যন্ত্রণায় বারান্দায় বসা যায় না। কয়েল, স্প্রে—কোনো কিছুতেই লাভ হচ্ছে না।” সাগুফতার বাসিন্দা জাহিদ হাসান যোগ করেন, “এমন মশা আগে দেখিনি। বিকেলের পর থেকেই মশার ঝাঁক নামে। মাগরিবের পর দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হয়।”

মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা জাকির সরকার সিটি করপোরেশনের তদারকি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, “এত মশা যে রাতে বাচ্চাদের পড়াতে বসানো যায় না। সিটি করপোরেশনে কোনো তদারকি আছে বলে মনে হয় না।” উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া দাবি করেন, কর্মীরা শুধু ছবি তোলার জন্য ওষুধের যন্ত্র এনে রাখে, প্রকৃত কাজ সীমিত।

কার্যকর সমাধানের আহ্বান

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দীর্ঘ অনুপস্থিতি মশা নিধনে সমন্বয় ও তদারকি ঘাটতি তৈরি করেছে। তিনি জরুরি ভিত্তিতে নালা-নর্দমা ও ডোবাগুলো পরিষ্কার করে লার্ভিসাইডিং কার্যক্রম শুরু করার পরামর্শ দেন।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস জানান, তাঁরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত কর্মসূচি শুরু করেছেন, কিন্তু ওষুধ মশার সংস্পর্শে না গেলে কার্যকর হবে না। এই পরিস্থিতিতে নাগরিকদের অস্বস্তি বাড়ছে এবং দ্রুত পদক্ষেপের দাবি উঠছে।