বাহারি রকমের ভর্তার জন্য পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বটতলা। কম দামে নানা স্বাদের ভর্তা শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের কাছে এ স্থানটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানে ভর্তার পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। তবে এ বাহারি আয়োজনের আড়ালে লুকিয়ে আছে খাদ্যমান ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ।
বাসি ভর্তা বিক্রির অভিযোগ
শিক্ষার্থীরা বলছেন, অনেক দোকানেই রাতের অবশিষ্ট ভর্তা পরদিন সকালে নতুন করে সাজিয়ে বিক্রি করা হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, বটতলার একটি খাবারের দোকানে রাতে ভর্তা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেই হোটেলের এক কর্মচারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ভর্তায় পেঁয়াজ দেওয়া হয়নি, তাই এটি ৭ দিন পর্যন্ত ভালো থাকবে। তবে পরদিন সকালে একই দোকানে গেলে ওই কর্মচারী দাবি করেন, ভর্তাটি সকালেই তৈরি করা হয়েছে। পরে রাতের তোলা ছবি দেখানো হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
শুধু একটি দোকানই নয়, একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে অন্য হোটেলগুলোতেও। রাতের বেলায় অতিরিক্ত ভর্তা পড়ে থাকতে দেখা গেলেও, দোকানিদের দাবি, এসব ফেলে দেওয়া হবে। কিন্তু পরদিন সকালে দেখা যায়, সেগুলোই বিভিন্ন রকম ভর্তা হিসেবে সাজিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে এসব ভর্তার মধ্যে পাথর বা পোকামাকড় পাওয়া যায়।
কেন বটতলা এত জনপ্রিয়?
অস্বাস্থ্যকর খাবার সত্ত্বেও এই বটতলার প্রতি মানুষের কেন এত আগ্রহ? জানতে চাইলে ঘুরতে আসা কয়েকজন জানান, মূলত খাবারের মূল্য অন্য জায়গার তুলনায় কম ও খাবার মুখরোচক হওয়ায় তারা এখানে আসেন। আর শিক্ষার্থীরা বলছেন, হলের ক্যান্টিন ও ডাইনিংয়ে খাবারের আইটেম সীমিত ও খাবারের মান বটতলার তুলনায় নিম্নমানের হওয়ায় তারা বাধ্য হয়েই এখানে খাচ্ছেন।
বটতলায় পাওয়া যায় বাদাম ভর্তা, সরিষা ভর্তা, পেঁপে ভর্তা, ডাল ভর্তা, শিম ভর্তা, ধনেপাতা ভর্তা, কালিজিরা ভর্তা, বেগুন ভর্তা, ঢ্যাঁড়শ ভর্তা, টমেটো ভর্তা, আলু ভর্তা, লাউশাক ভর্তা, কলা ভর্তা, কচু ভর্তা, রসুন ভর্তা, ডিম ভর্তা, মরিচ ভর্তা। এছাড়া শুঁটকি মাছের ভর্তা, চিংড়ি মাছের ভর্তা, টাকি মাছের ভর্তা, রুই মাছের ভর্তা, চিকেন ভর্তা, লইট্টা শুঁটকিসহ বাহারি ভর্তা।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চিকিৎসকদের মতামত
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বটতলার এসব মুখরোচক খাবার স্বাস্থ্যসম্মত নয়। বাহারি এসব খাবারে রয়েছে বেশ স্বাস্থ্যঝুঁকি। যে কারণে এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। আবার এসব খাবারের কারণে দীর্ঘমেয়াদি লিভারের সমস্যায়ও ভুগছেন অনেকেই। প্রতিদিন অনেকেই বিভিন্ন পেটের পীড়া বা গ্যাস্ট্রিকের মতো রোগ নিয়ে হাজির হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে।
চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রধান মেডিকেল অফিসার ডা. মো. শামছুর রহমান বলেন, রাতের খাবারের সঙ্গে পরের দিনের খাবার মিশিয়ে বিক্রয় এবং সেগুলো খাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বটতলার খাবার অনেক বেশি অস্বাস্থ্যকর। একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন এগুলো খেলে দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগতে পারে। কয়েক বছর ধরে নিয়মিত কেউ যদি বটতলার খাবার খায়, তবে তার শরীরের দুই ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এর মধ্যে একটি তাৎক্ষণিক সমস্যা যেমন পেট ব্যথা, বমি সৃষ্টি করে অন্যটি দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস্ট্রিক, আলসার, লিভারসহ নানা ধরনের রোগ হতে পারে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও আ ফ ম কামাল উদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষ এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, দোকানগুলো যে যে হলের অধীনে রয়েছে, আমি সে সব হলের প্রাধ্যক্ষকে জানিয়েছি। তারা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। যে কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করব। প্রাধ্যক্ষদের নিয়মিত দোকান পরিদর্শন করার কথা বলা হয়েছে।



