সংবিধান সংস্কার নাকি ফ্যাসিবাদ? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র বিতর্ক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবন প্রাঙ্গণে বৃহস্পতিবার সকালে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। 'সংবিধান ও সংস্কার: নতুন বাংলাদেশ নাকি পুরোনো ফ্যাসিবাদ' শীর্ষক এই সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নিয়ে তীব্র বক্তব্য রাখেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েম।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার তার বক্তব্যে বলেন, 'ক্ষমতা কুক্ষিগত করা থেকে শুরু করে বিএনপি যা যা করতে চেয়েছে, তা করতে পারেনি। তারা রাস্তা দেখিয়েছে, ওই রাস্তায় সফলভাবে আওয়ামী লীগ হেঁটেছে। সে জন্য আওয়ামী লীগ হতে পেরেছে সফল বিএনপি। অন্যদিকে বিএনপি আওয়ামী লীগ হতে চায়, কিন্তু পারে না, তাই তারা ব্যর্থ আওয়ামী লীগ।'
তিনি বিএনপির উদ্দেশে আরও বলেন, 'যখন গণভোট হয়ে গিয়েছে, তখন তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গণভোটকে তারা মানবে না। এখন গণভোট না মানার জন্য তো একটা ঢাল ব্যবহার করতে হবে। সেই ঢালটা হলো জুলাই সনদ। আল্টিমেটলি জুলাই সনদও কিন্তু তারা মানবে না, জুলাই সনদ তারা বাস্তবায়ন করবে না।'
বাহাত্তরের সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, 'বাহাত্তরের সংবিধান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কোনোভাবেই পরিপূর্ণভাবে ধারণ করে না। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান একাত্তরের চেতনা সংরক্ষণ ও বাহাত্তরের বিচ্যুতি সংশোধন করার উদ্দেশ্যে ঘটেছে।'
তিনি বিএনপির ভুল সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, 'বিএনপির ভুল সিদ্ধান্ত যতটুকু না বিএনপিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা যারা এন্টি-ভারতীয় (ভারতবিরোধী) এবং এন্টি-আওয়ামী (আওয়ামী লীগবিরোধী) শক্তি রয়েছি, তারা। এ জন্য বিএনপির প্রতিটি ভুল আমাদেরকে প্রচণ্ডভাবে কষ্ট দেয়।'
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, 'আজ এই মুহূর্তটি স্বাধীনতা ও ন্যায়ের জন্য একটি কালো দিন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ধ্বংস করার চেষ্টা করলে, তা দেশের জন্য ভালো হবে না। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে একটি বড় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে বিচার বিভাগ এবং পার্লামেন্টের মধ্যে একটি সংঘাত তৈরি হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীন থাকতে চান, অথচ পার্লামেন্ট স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইছে। এই পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক।'
সরকারের সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জ
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, 'আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা আমাদেরকে প্রতিদিন আইন শেখান, যেন বাংলাদেশে ওনাদের মতো আইন বোঝা মানুষ নেই। আমি আর শিশির মনির বাংলাদেশ সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে গেলাম সংবিধানের আলোকে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'গত পরশু দিন কীভাবে আমার ক্রিকেট বোর্ড দখল করে ফেলল বিভিন্ন সংসদ সদস্যের স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে এ ধরনের লোক দিয়ে। বলা ছিল প্রজাতন্ত্রের কথা কিন্তু আপনারা কায়েম করলেন পারিবারিক রাজতন্ত্র। আমরা আপনাদের সতর্ক করছি, নিজেদের পথ সংশোধন করে নেন। আপনারা আমাদের শত্রু রাজনৈতিক দল নয়।'
অন্যান্য বক্তাদের অংশগ্রহণ
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভাপতি অধ্যাপক শামীমা তাসনিম, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, সমকাল পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি রাজীব আহাম্মদ, ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) আবু সাদিক কায়েমসহ ডাকসু অন্য সদস্যরা।
এই সভাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) কর্তৃক আয়োজিত হয়েছিল এবং এতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংবিধান সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে গভীর আলোচনা হয়।



