শাহদীন মালিকের স্মারক বক্তৃতায় সংবিধান ও আইনের শাসন নিয়ে তীব্র সমালোচনা
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধানবিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেছেন, '১৯৭২ সালের সংবিধান নির্ভুল ছিল না। তার কোনো দোষ-ত্রুটি ছিল না, তা–ও নয়। কিন্তু বিগত ১৫ বছরের স্বৈরশাসন, জবাবদিহিহীনতা বা স্বেচ্ছাচারিতা—এটা সংবিধানের দোষ নয়। সংবিধানকে যারা বারবার অপব্যবহার করেছে, তাদের দোষ।' আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে 'মুক্তিযুদ্ধ ও বাহাত্তরের সংবিধান' শীর্ষক স্মারক বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। গত ২২ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পূর্ণ হয়েছে। ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এই স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি।
আইনের শাসন না থাকার দোষ আইনের নয়
বক্তৃতায় শাহদীন মালিক উল্লেখ করেন, 'বিগত বছরগুলোতে দেশে আইনের শাসন না থাকার দোষ আমরা আইনকে দিচ্ছি। বলা হচ্ছে, আইনের শাসন না থাকার দোষ হলো আইনের। আইনের শাসন না থাকার দোষ কিন্তু আইনের নয়; আইনকে যারা অপপ্রয়োগ করে, দোষ তাদের।' তিনি আরও বলেন, দেশে আইনের শাসন ও জবাবদিহি না থাকার মূল দোষ আইনের নয়, বরং যারা আইনটাকে অপপ্রয়োগ করে বা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে, তাদের কথা ভুলে গিয়ে আইনকে দোষ দেওয়া সুবিচার নয়।
বাহাত্তরের সংবিধানের রচয়িতারাই বিচ্যুতির জন্য দায়ী
শাহদীন মালিক বাহাত্তরের গণপরিষদ সদস্যদের প্রশংসা করে বলেন, দেশে তখন যে পরিস্থিতি ছিল, তাতে চাইলে আরও দু-তিন বছর গণপরিষদ সংসদ হিসেবে কাজ করতে পারত। কিন্তু তাঁরা সেটা করেননি। গণপরিষদ সংবিধান প্রণয়ন করে চলে গেছে, নিজের মেয়াদ বৃদ্ধি করেনি, এই উদাহরণ আর পাওয়া যাবে না বললেই চলে। তিনি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এক বছর ধরে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও ভালো-মন্দ যাচাইয়ের পর বাহাত্তরের সংবিধান হয়েছিল।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, 'জনগণের ক্ষমতা ও অধিকার নিশ্চিত করার মহৎ উদ্দেশ্যে বাহাত্তরে যে সংবিধান হয়েছিল, তার থেকে সরে আসার যাত্রা সাত মাসের মাথায় প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। সবচেয়ে সর্বগ্রাসী ছিল ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে হওয়া চতুর্থ সংশোধনী। এর মাধ্যমে একদলীয় বাকশালী ব্যবস্থাটা চালু হয়ে গেল।' সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে সামরিক ফরমান জারি করে সংবিধান সংশোধনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
সংসদে আইন নিয়ে আলোচনা হয় না
কয়েকটি সংসদের কার্যবিবরণী পড়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে শাহদীন মালিক বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সংসদে আইন সম্পর্কে কোনো আলোচনাই হয় না। আইনটিতে কী লাভ-ক্ষতি, প্রয়োগ হলে তাঁরা কীভাবে লাভবান হবে, সেই আলোচনায় জনগণের অংশগ্রহণ থাকে না। তিনি বলেন, 'যেকোনো আইন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনা ও চিন্তাভাবনা করে, কেন কী করা হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য কী—এগুলো দেখতে হবে। এই আলোচনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সংসদ হলো আইন প্রণয়নের জন্য আলাপ-আলোচনার জায়গা।'
তিনি আরও বলেন, গত কয়েকটি সংসদে ৬০-৭০ শতাংশ ছিলেন ব্যবসায়ী। তাঁরা বোধ হয় কখনো আইনও পড়েননি। ফলে আইন নিয়ে আলোচনাগুলো হয় না। এই আলোচনাগুলো হওয়া দেশে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাশীল হওয়ার পূর্বশর্ত।
সব ক্ষেত্রে 'ইয়েস' বললে সংসদের দরকার কী
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে বর্তমান সংসদে যে আলোচনা হচ্ছে, সে প্রসঙ্গেও কথা বলেন শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, যদি আলোচনাটা এমন হয় যে এই সংসদের উচিত হবে সব অধ্যাদেশগুলোর ক্ষেত্রে হুবহু 'ইয়েস' বলে দেওয়া, তাহলে সংসদের দরকার কী? অন্তর্বর্তী সরকার প্রতি চার দিনে একটা করে অধ্যাদেশ জারি করেছে। কীভাবে জারি করেছে? উপদেষ্টাসহ কয়েকজন মিলে একটা কক্ষে আলোচনা করেছেন। অধ্যাদেশের কারণ কী, পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি কী, এটা হলে ভালো-খারাপ কী হবে—এই আলোচনায় কেউই অংশীদার ছিলাম না।
তিনি টিপ্পনী কেটে বলেন, 'সংবিধানে বলা আছে, সংসদের দুটি অধিবেশনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬০ দিন বিরতি থাকতে পারে। কিন্তু আলোচনা শুনে মনে হচ্ছে, বিরতিটা ৬০ দিনের জায়গায় ১৮০ দিন করে দেওয়া উচিত। এই ছয় মাসে নির্বাহী বিভাগ বা সরকার অধ্যাদেশ করবে, সংসদ ছয় মাস পর তিন দিনের জন্য অধিবেশন করে বলবে পাস, পাস, পাস, পাস, পাস।'
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অনুদান বন্ধ হওয়া
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাদুঘরে সরকারি সহযোগিতার ব্যত্যয় ঘটেছে। কোনো ঘোষণা ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অনুদান বন্ধ হলো। এ ধরনের ঘটনার পর দুটি উপলব্ধি হয়েছে। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস তুলে ধরতে হলে জাদুঘরকে আরও স্বনির্ভর হতে হবে। আর দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সর্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হকও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ট্রাস্টি বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সরকারি তহবিলে দেওয়া অর্থ বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি, পৌরকর, নিরাপত্তারক্ষী জোগান ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় ছাড়া অন্য খাতে গ্রহণ করা হবে না। জাদুঘর জনগণের সহায়তায় স্বীয় পরিচালন ব্যয় নির্বাহ ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ত্রপা মজুমদার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। শিল্পী ওয়ার্দা আশরাফের সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শেষ হয়।



