বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় নাগরিক কোয়ালিশনের জরুরি আহ্বান
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক্করণ সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে নাগরিক কোয়ালিশন। গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক জরুরি বিবৃতিতে এই নাগরিক প্ল্যাটফর্মটি তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানায়।
জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশ ও এর প্রভাব
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি (অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি) যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ-২০২৫ সহ মোট চারটি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। নাগরিক কোয়ালিশন এই সিদ্ধান্তকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বহুল প্রতীক্ষিত ও সব মহলের প্রত্যাশিত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর জন্য একটি বড় ধরনের বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ও ক্ষমতার পৃথক্করণের নীতির সঙ্গে এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে জনপরিসরে ইতিমধ্যেই গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে বলে বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নাগরিক কোয়ালিশন দাবি করেছে, এই উদ্যোগ বর্তমান সরকারি দল বিএনপি ঘোষিত ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা’, তাদের স্বাক্ষরিত লিখিত জাতীয় অঙ্গীকারভিত্তিক ‘জুলাই সনদ’ এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাহী বিভাগ থেকে কার্যকর পৃথক্করণ এবং আইনের শাসন সুসংহত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তার সরাসরি লঙ্ঘন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
গণভোটের রায় ও জাতীয় ঐকমত্যের গুরুত্ব
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গণভোট-২০২৬–এ এসব সংস্কারের পক্ষে দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভোটার তাদের রায় প্রদান করেছে। ফলে এই পরিত্যাগের প্রক্রিয়া দেশের মানুষের অবাধ ও সুস্পষ্ট অভিপ্রায়কে পদদলিত করার শামিল। গত কয়েক যুগ ধরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক্করণের দাবি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠন এবং আইনজীবী সমাজ করে আসছে উল্লেখ করে নাগরিক কোয়ালিশন বলেছে, এই সম্পর্কে জাতীয় ঐকমত্য ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এটি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর জন্য অপরিহার্য।
নাগরিক কোয়ালিশন তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেছে, ‘দেশের নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমরা মনে করি, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে যেকোনো পরিবর্তন এমনভাবে হওয়া উচিত, যাতে আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন আরও শক্তিশালী হয়, দুর্বল না হয়।’ এই বক্তব্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় তাদের দৃঢ় অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
সরকারের প্রতি চূড়ান্ত অনুরোধ
নাগরিক কোয়ালিশনের পক্ষে সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সই করা বিবৃতির শেষাংশে বলা হয়, নাগরিক কোয়ালিশন সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে—বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক্করণসংক্রান্ত ঘোষিত নীতিগত প্রতিশ্রুতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হোক। তারা আশা প্রকাশ করে যে সরকার জনগণের আস্থা রক্ষা করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে এই বিষয়ে দ্রুত ও যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নেবে।
এই আহ্বানটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা এবং সরকারের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নাগরিক কোয়ালিশনের এই উদ্যোগ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।



