সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র
গত ১২ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের পর গঠিত বিএনপি সরকার এবং বিরোধী ১১ দলীয় জোটের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। সরকারের বয়স মাত্র দেড় মাস হলেই ইতিমধ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে সংসদ থেকে রাজপথে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী দলের বিক্ষোভ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সহ ১১ দলীয় জোট জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে শনিবার বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে। বিরোধী দল দাবি করছে, সংবিধান সংস্কারের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলেও সরকারি দল বিএনপি জনরায় উপেক্ষা করে তাদের পছন্দমতো সংশোধনীর উদ্যোগ নিচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের জানান, “সরকার সংসদে গণভোটের সমাধান না করলে ১১ দলের উদ্যোগে আন্দোলন চলবে।” বিরোধী জোট ৭ এপ্রিল শীর্ষ নেতাদের বৈঠক ডেকে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে।
সরকারের অবস্থান: সংস্কার পরিষদ অস্তিত্বহীন
অন্যদিকে, সরকারি দল বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদকে অস্তিত্বহীন ও আইনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তবে আরোপিত আদেশ একদিনে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।” তিনি সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন, যা রোববারের মধ্যে গঠন করা হবে।
অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ ও আইনি জটিলতা
সংসদীয় কমিটি বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তী সরকারের গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হতে পারে। অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের মতে, অধ্যাদেশটি ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে উপস্থাপন না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। তবে ব্যারিস্টার আহসানুল করিম বলেছেন, অধ্যাদেশ বাতিল হলেও গণভোট বাতিল হবে না, কারণ এটি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে।
এদিকে, হাইকোর্ট ৩ মার্চ গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন, যা আইনি জটিলতা বাড়াচ্ছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এসব কারণে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
গণভোটের পরিসংখ্যান ও জটিলতা
১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে ৬০.২৬% ভোট পড়েছে, যেখানে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে ৬৮% সমর্থন পেয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতির ১৩ নভেম্বরের আদেশ অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করতে হবে, যা এখনো হয়নি। এই শূন্যতা আইনি জটিলতা তৈরি করেছে এবং আদালতের মাধ্যমে সমাধান হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিরোধী দল সতর্ক করে দিয়েছে যে, সরকার যদি গণভোটের রায় মানতে ব্যর্থ হয়, তবে রাজপথে কঠোর আন্দোলন ছাড়া তাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই। এই পরিস্থিতিতে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে।



