কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার প্রায় ১৪০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক সোনাহাট সেতুর স্টিলের পাটাতন ভেঙে গেছে। এর ফলে আজ বুধবার সকাল থেকে সেতু দিয়ে সব ধরনের ভারী যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনার বিবরণ
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার বরাতে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সেতুটির বিভিন্ন স্থানের স্টিলের পাটাতন ও লোহার প্লেট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যেও জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন শত শত যানবাহন সেতুটি ব্যবহার করছে। এর মধ্যে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বালুবাহী একটি ডাম্প ট্রাক সেতুটি পার হওয়ার সময় স্টিলের পাটাতন ভেঙে সেতুর ওপর আটকে পড়ে। এতে সেতুর দুই প্রান্তে পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি সৃষ্টি হয়।
সেতুর ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮৭ সালে লালমনিরহাট থেকে ভারতের গুয়াহাটি পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের অংশ হিসেবে দুধকুমার নদের ওপর প্রায় ১ হাজার ২০০ ফুট দীর্ঘ সোনাহাট রেলসেতু নির্মাণ করা হয়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সেতুর একটি অংশ ধ্বংস করা হয়েছিল। পরে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে এটি সংস্কার করে সড়ক সেতু হিসেবে চালু করা হয়। নির্মাণের সময় সেতুটির আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছিল ১০০ বছর। সেই মেয়াদ প্রায় চার দশক আগেই শেষ হয়েছে।
বর্তমানে এই সেতুর মাধ্যমে ভূরুঙ্গামারীর দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়ন এবং কচাকাটা ও মাদারগঞ্জ এলাকার মানুষের যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, পাটাতন উঠে যাওয়ায় যেকোনো সময় সেতুতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সেতু অচল হয়ে গেলে সোনাহাট স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
নতুন সেতুর নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ
এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো সেতুর পাশেই দুধকুমার নদের ওপর ১৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৪৫ মিটার দীর্ঘ নতুন সোনাহাট সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। দুই বছরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আট বছর পেরিয়ে গেলেও নির্মাণ শেষ হয়নি। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
সেতু–সংলগ্ন এলাকার ব্যবসায়ী ইসলাম ও নুর ইসলাম বলেন, পাথরবোঝাই ট্রাক চলাচলের সময় পুরো সেতু কেঁপে ওঠে। সেতুটি এতটাই সরু যে একটি ট্রাক পার হওয়ার সময় অন্য কোনো যানবাহন চলতে পারে না। এতে প্রায়ই দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ
সোনাহাট স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী আবু হেনা মাসুম জানান, স্টিলের ঐতিহাসিক এই সেতুতে প্রায়ই পাটাতন ভেঙে যায়। পরে সড়ক বিভাগ তা মেরামত করে; কিন্তু স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ হলে স্থলবন্দরের বাণিজ্য ব্যাহত হবে এবং সরকার রাজস্ব হারাবে।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ বলেন, সেতুটি দ্রুত সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। এই সেতুর ওপর নিয়ে অতিরিক্ত পণ্য বহনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুড়িগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্কার শেষ হলে যত দ্রুত সম্ভব সেতু দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হবে।



