দুবলারচরে বনদস্যু আতঙ্ক: মাছ ধরা বন্ধ, দশ সহস্রাধিক জেলে চরে আটকা
দুবলারচরে বনদস্যু আতঙ্কে মাছ ধরা বন্ধ, জেলেরা চরে

দুবলারচরে বনদস্যুদের তাণ্ডবে মাছ ধরা বন্ধ, জেলেরা আতঙ্কিত

সুন্দরবন সংলগ্ন দুবলারচর এলাকায় বনদস্যুদের আতঙ্কে দশ সহস্রাধিক শুঁটকিকরণ জেলে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে সাগর ও নদীতে মাছ ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন। জেলেরা এখন নিরাপত্তাহীনতার কারণে চরেই অবস্থান করছেন, যেখানে তাদের জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

অপহৃত জেলেদের সন্ধান নেই, দস্যুদের উৎপাত বৃদ্ধি

গত সোমবার রাতে কমপক্ষে ২০ জন জেলেকে অপহরণ করা হয়েছে, এবং দুদিন পরও তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি। দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, দস্যুরা জেলেদের ধরে নিয়ে মুক্তিপণ আদায় করছে এবং যারা টাকা দিতে অক্ষম তাদের মারধর করছে। গত সপ্তাহে চার জন জেলে গুরুতর আহত হয়ে রামপাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সুন্দরবনে জাহাঙ্গীর, সুমন, শরীফ ও করিম বাহিনী নামে চারটি দস্যু গ্রুপ সক্রিয়ভাবে অপহরণ ও লুণ্ঠন চালাচ্ছে। আলোরকোলের রামপাল জেলে সমিতির সভাপতি মোতাসিম ফরাজী বলেন, “আগে প্রবাদ ছিল ‘জলে কুমির, ডাঙ্গায় বাঘ’, এখন যুক্ত হয়েছে ‘সাগরে গেলে ডাকাত’।” তিনি আরো উল্লেখ করেন যে গত ১৫ দিনে বহু জেলে অপহৃত হয়েছে এবং বর্তমানে কমপক্ষে শতাধিক জেলে দস্যুদের কবজায় আটক রয়েছে।

বন বিভাগের রাজস্ব ঘাটতি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব

দস্যু আতঙ্কে জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ রাখায় সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মিলটন রায় বলেন, জেলেরা মাছ ধরার পাশ না নেওয়ায় তাদের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শরণখোলা ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমানও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শরণখোলা বাজারের মুদি দোকানি জালাল মোল্লা, আনোয়ার সওদাগর ও রিপন হাওলাদার জানান, জেলেরা সুন্দরবনে না যাওয়ায় তাদের বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব ও সরকারি পদক্ষেপ

দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি দাবি করেন, ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে দস্যুরা আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার অভাবকে এই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম জানান, দস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং বনরক্ষীরা জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন। তবে জেলেরা এখনো আতঙ্কে রয়েছেন এবং মৌসুমের শেষে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

এই সংকটের সমাধান না হলে শুঁটকি শিল্প ও সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।