চট্টগ্রাম নগরের ফলের আড়ত ফলমন্ডিতে বিক্রির জন্য আনা লিচু স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কিছু ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ক্রেতাদের আকর্ষণের জন্য। নগরের দুই নম্বর গেট এলাকায় লিচু কিনতে এসেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। কয়েকজন ফল বিক্রেতা ভ্যানে লিচু নিয়ে বসেছেন। জামাল উদ্দিন বেশ কয়েকজনের সঙ্গে দরদাম করেও ফিরে যাচ্ছিলেন না কিনেই। কথা বলতে চাইলে বিরক্ত মুখে বলেন, ‘বাজারে লিচুর অভাব নেই। কিন্তু দাম দেখে তা মনে হয় না। ঈদের আগে ১০০ লিচু ৩০০ টাকায় কিনেছিলাম। এখন একই মানের লিচু কিনতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাগছে। লিচু কি ধনীদের ফল হয়ে উঠছে?’
জামাল উদ্দিন যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, তার উত্তর খুঁজতে গিয়ে সত্যতা পাওয়া গেল অনেকাংশে। ফলের মৌসুম মানেই আম, কাঁঠাল আর লিচুর উৎসব। চট্টগ্রামের বাজারেও এখন সেই আমেজ। ফলমন্ডি, বহদ্দারহাট, চকবাজার কিংবা দুই নম্বর গেট—যেদিকেই চোখ যায়, আমের পাশাপাশি দেখা মিলছে লালচে রঙের লিচুর থোকা। ট্রাকে ট্রাকে লিচু আসছে। আড়তের সামনে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে ঝুড়ি আর কার্টন। কিন্তু সরবরাহ বাড়লেও খুচরা বাজারে দাম কমার তেমন লক্ষণ নেই।
পাইকারি বাজারে কী দাম
নগরের স্টেশন রোডের ফলমন্ডিতে গিয়ে দেখা যায়, একের পর এক ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছে লিচুভর্তি ঝুড়ি। শ্রমিকেরা সেগুলো মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছেন আড়তে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন খুচরা বিক্রেতারা। কেউ লিচু বাছাই করছেন, কেউ দরদাম করছেন। কোথাও আবার চলছে নিলাম। ফল ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে লিচুর মৌসুম শুরু হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কোনো কোনো এলাকায় আরও আগে বাজারে লিচু উঠতে শুরু করে। প্রধান মৌসুম থাকে মে মাসের শেষ ভাগ থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত। দিনাজপুর, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও দেশের প্রধান লিচু উৎপাদন এলাকা। বর্তমানে চট্টগ্রামের বাজারে বেশির ভাগ লিচু রাজশাহী, দিনাজপুর ঈশ্বরদী অঞ্চল থেকে আসছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগামী দুই সপ্তাহ সরবরাহ আরও বাড়বে। এরপর ধীরে ধীরে মৌসুম শেষের দিকে যাবে।
ফলমন্ডির একাধিক আড়ত ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে ১ হাজার লিচু বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি লিচুর পাইকারি দাম পড়ছে আড়াই থেকে সাড়ে তিন টাকার মধ্যে। পাইকারি ফল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মিঠু বলেন, লিচুর সরবরাহ এখন অনেক। প্রতিদিন ট্রাক আসছে। কিন্তু বাগান থেকে কিনতে বেশি টাকা লাগছে। পরিবহন খরচও বেড়েছে। তাই বাজারে দাম খুব একটা কমছে না। মেসার্স সায়েম অ্যান্ড সাইফা এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মোহাম্মদ সুমন বলেন, ‘ঈদের ছুটির পর পুরোদমে লিচু আসছে। পাইকারি বাজারে দাম ততটা বাড়েনি। আমরা সীমিত লাভেই ব্যবসা করছি।’
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী হোসেন গতকাল শনিবার ৫০০ লিচু কিনেছেন ১ হাজার ৭৫০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি লিচুর দাম পড়েছে সাড়ে তিন টাকার মতো। তবে লিচুর দাম বাড়তি হওয়ার বিষয়ে তিনি সরাসরি উত্তর দেননি। তিনি দাবি করেন, ‘পাইকারিতে বাজারে দাম অস্বাভাবিক নয়। তবে খুচরা বাজারে কেউ কেউ এক-দুই টাকা মুনাফা করছেন।’
খুচরা বাজারে কেন বেশি
ফলমন্ডি থেকে লিচু কিনে নগরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। চকবাজারের ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন পাঁচ ক্রেট লিচু কিনেছেন। তিনি বলেন, ঈদের আগে পাইকারিতে দাম কিছুটা কম ছিল। এখন প্রতিটি লিচুতে এক থেকে দেড় টাকা বেশি পড়ছে। তাই খুচরা বাজারেও কম দামে বিক্রি করা কঠিন। নগরের চকবাজার, দুই নম্বর গেট, স্টেশন রোড ও বহদ্দারহাট এলাকার ফলের দোকান ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৯০০ টাকায়। ছোট আকারের লিচুর দাম তুলনামূলক কম। বড় ও আকর্ষণীয় লিচুর দাম বেশি। দুই নম্বর গেটের এক ফল বিক্রেতা বলেন, ছোট লিচু প্রতিটি ৫ থেকে ৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় লিচুর দাম ৮ থেকে ৯ টাকা।
গতকাল কাজীর দেউড়ি এলাকায় ভ্যানগাড়িতে লিচু বিক্রি করছিলেন মোহাম্মদ মোতালেব। ১০০ লিচুর দাম নেন ৭০০ টাকা। দাম বাড়তি কি না—এমন প্রশ্নে মোতালেব বলেন, ‘এগুলো ভালো লিচু। মিষ্টি। পচা নাই। তাই দামও বাড়তি।’ লিচুর কেনা কত, এ প্রশ্নের উত্তর দেননি মোতালেব। ফল ব্যবসায়ীরা বলছেন, লিচুর মৌসুম খুব বেশি দিনের নয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মৌসুম শেষ হয়ে যায়। এ কারণে মৌসুমের শুরু ও মাঝামাঝি সময়ে চাহিদা বেশি থাকে। অনেকে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠানোর জন্য একসঙ্গে বেশি পরিমাণে লিচু কেনেন। এতে বাজারে চাহিদা বেশি থাকে।



