সুবর্ণপুরাণ: ভাটি বাংলার বিরল শিল্প-অভিজ্ঞতা
সুবর্ণপুরাণ: ভাটি বাংলার বিরল শিল্প-অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশে ইদানীং ইতিহাস–আশ্রিত উপন্যাস লেখার একটা ট্রেন্ড লক্ষ করা যাচ্ছে। এর একটা বড় অংশ ঐতিহাসিক চরিত্রদের নিয়ে। বাকি অংশ ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে রচিত হচ্ছে। এটাকে ভালো লক্ষণ হিসেবে সাব্যস্ত করতে চাই। ইতিহাস-অনুসন্ধিৎসা স্বজাতিকে গভীরভাবে বুঝতে ও খুঁজতে চাওয়ারই নামান্তর।

প্রকাশিত কিছু ইতিহাস–আশ্রিত উপন্যাস পড়ে দেখেছি। অধিকাংশই ‘ইতিহাসের ভাষায়’ লেখা। কিন্তু ফিকশনের ভাষা আর ইতিহাসের ভাষা তো এক নয়। অধিকাংশ উপন্যাসে ঔপন্যাসিকের ওপর ইতিহাস চেপে বসে। পড়তে গেলে মায়া লাগে ঔপন্যাসিকের জন্য। সবচেয়ে বড় যে সমস্যা চোখে পড়ে তা হচ্ছে, এসব উপন্যাসে ঔপন্যাসিকের বড় কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। ভাব-চক্কর দেখে মনে হয়, শুধু ঐতিহাসিক ঘটনা ও চরিত্রের সঙ্গে উপন্যাসকে যুক্ত করাটাই ঔপন্যাসিকের জন্য যেন একটা গৌরবের ব্যাপার। উপন্যাস হয়েছে কি না, সেটা মুখ্য ব্যাপার নয়।

উপন্যাসের সময়কাল ও কাঠামো

পারভেজ হোসেনের সুবর্ণপুরাণ একটি ইতিহাস–আশ্রিত উপন্যাস। এই উপন্যাসের সময় ১৫৯৯ থেকে ১৬১০। আসলে এই সময়ের পুরোটাও নয়। উপন্যাসের উল্লেখ-ইশারা দেখে মনে হয়, ১৬১০ সালের আগের বছর কয়েক এই উপন্যাসের সময়। এই অল্প সময় পরিসরে পারভেজ হোসেন একটা উপন্যাস জমিয়ে তুলতে চেয়েছেন। তিনি ‘মহিমামণ্ডিত ইতিহাস’ ও ‘ঐতিহাসিক চরিত্রের’ সঙ্গে নিজের উপন্যাসকে যুক্ত করে ফাঁপা গৌরবের অংশীদার হতে চাননি। ইতিহাসকে ঔপন্যাসিক সত্তার ওপরে উঠতে দেননি। ভাষা, চরিত্র আর কাহিনির ওপর অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছেন। কিন্তু ইতিহাসকে উপন্যাস-শিল্পে রূপান্তরের কসরতের দাগ ভাষার গায়ে নানা জায়গায় একেবারে নেই, তা নয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চরিত্র ও কাহিনি

উপন্যাসের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ও মূল্যবান অংশ রাফায়েলের সোনারগাঁয়ের অভিজ্ঞতা। এখানেই পারভেজ হোসেনের এই উপন্যাস লেখার উদ্দেশ্যের প্রাণভোমরা লুকানো। এই পর্বে ঢুকে আসলে ঔপন্যাসিক সপ্তদশ শতকের শুরুর দশকের ভাটি বাংলাকে উন্মোচন করেছেন। উপন্যাস পাঠান্তে পাঠক আবিষ্কার করবেন, এটাকে উন্মোচন না বলে ‘নির্মাণ’ বলাই ভালো।

মুসা খাঁর শাসনকালের সোনারগাঁর ইতিহাসকে পারভেজ অবলম্বন করেছেন। কিন্তু উপন্যাসে মুসা খাঁ নেই। নেই কোনো রাজরাজড়া, আমির-ওমরাহ। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘ছিপছিপে তরুণ নাবিক, মালাক্কাবাসী পর্তুগিজ খ্রিষ্টান, ফ্রান্সিস রাফায়েল’। আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ‘মধ্যবয়সী, দীর্ঘদেহী, পাগড়িধারী মরক্কোর মোছলমান পর্যটক—আবু ইবনে আল আসাদ’। আছে ‘বাঙ্গালার বণিক হাফিজুদ্দিন শেখ’। তারা বেশ কিছুদিন একই জাহাজে করে বাংলায় আসছিল। জাহাজেই পরস্পরের সঙ্গে আলাপ। উপন্যাসের প্রায় ৭০ পৃষ্ঠাজুড়ে আছে বাংলায় পর্তুগিজদের কীর্তিকলাপ, তরুণী আদ্রিয়ার সঙ্গে রাফায়েলের প্রেমের স্মৃতি, বাংলা সম্পর্কে ইবনে আসাদের পর্যবেক্ষণ আর নীল জলরাশি-ঝড়-ঝঞ্ঝা-বিপদ-আপদ। এক অর্থে, পুরোটাই কল্পনা। ঐতিহাসিক চরিত্রদের তেমন কোনো আনাগোনা নেই। ঔপন্যাসিক কল্পনাকে যত্রতত্র চারিয়ে দিয়েছেন। অবাধ স্বাধীনতা নিয়েছেন। আবার এরই মধ্যে চরিত্রদের তর্কের সূত্র ধরে উঠে এসেছে পর্তুগিজদের ঔপনিবেশিক শক্তি হয়ে ওঠার প্রাণান্ত চেষ্টার ইতিহাস।

ভাটি বাংলার নির্মাণ

উপন্যাসের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক ও মূল্যবান অংশ রাফায়েলের সোনারগাঁয়ের অভিজ্ঞতা। এখানেই পারভেজ হোসেনের এই উপন্যাস লেখার উদ্দেশ্যের প্রাণভোমরা লুকানো। এই পর্বে ঢুকে আসলে ঔপন্যাসিক সপ্তদশ শতকের শুরুর দশকের ভাটি বাংলাকে উন্মোচন করেছেন। উপন্যাস পাঠান্তে পাঠক আবিষ্কার করবেন, এটাকে উন্মোচন না বলে ‘নির্মাণ’ বলাই ভালো।

পারভেজ হোসেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে পরিচিত নাম। ছোটগল্পে তাঁর সাফল্য ইতিমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে পাঠকমহলে। তাঁর ইতিহাস ও দর্শনচেতন মনের হদিসও পাঠকেরা রাখেন। এবার সুবর্ণপুরাণ উপন্যাসে ভাটি বাংলা, তথা বাংলাদেশের যে স্বরূপ পারভেজের হাতে নির্মিত হলো, তা বাংলাদেশের উপন্যাসে বিরল শিল্প-অভিজ্ঞতা হিসেবে পাঠক চিহ্নিত করতে পারবেন—এটা বোধ করি অত্যুক্তি নয়।

ভাটি বাংলা সারা পৃথিবীর বণিকদের কেমন আগ্রহের জায়গা ছিল; কেমন ছিল এখানকার সংস্কৃতি, হাট-বাজার-মাঠ-ঘাট-প্রাণ-প্রকৃতি; খাল-বিল-ঝিল-নদী-নালা-হাওর-বাঁওড়ের সঙ্গে এখানকার মানুষের স্বভাব-সংস্কৃতির সম্পর্কই-বা কেমন, তার এক নিবিড় ‘নির্মাণ’ আছে এই উপন্যাসে। তিনি এমন এক ভূখণ্ডের রূপকল্প হাজির করতে পেরেছেন, যাকে পৃথিবীর যেকোনো দেশ থেকে আলাদা করে চেনা যায়। বলা যায়, এ তো ‘ভাটি বাঙ্গালা’।

কিন্তু এ কথা বলতেই হবে যে ভাটি বাংলাকে নির্মাণ করতে গিয়ে ঔপন্যাসিক এখানকার যাপিত জীবনের অন্দরে ঢুকেছেন কম। ঢুকলে যে সাফল্য আসতে পারত, তার স্বাক্ষর খোদ উপন্যাসের মধ্যেই আছে। পারভেজ যেখানে যাপিত জীবনের মধ্যে ঢুকেছেন, সেখানে উপন্যাসোচিত রোশনাইয়ের মাত্রাও উপচে পড়েছে। কিন্তু ওই দিকে কম যাবেন বলেই কি একজন বিদেশি নাবিক-পর্যটককে কেন্দ্রীয় চরিত্র করেছেন! এটা কি তবে ঔপন্যাসিকের শিল্পচাতুর্যের অংশ! কিন্তু আফসোস রয়েই যায়।

পারভেজ হোসেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে পরিচিত নাম। ছোটগল্পে তাঁর সাফল্য ইতিমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে পাঠকমহলে। তাঁর ইতিহাস ও দর্শনচেতন মনের হদিসও পাঠকেরা রাখেন। এবার সুবর্ণপুরাণ উপন্যাসে ভাটি বাংলা, তথা বাংলাদেশের যে স্বরূপ পারভেজের হাতে নির্মিত হলো, তা বাংলাদেশের উপন্যাসে বিরল শিল্প-অভিজ্ঞতা হিসেবে পাঠক চিহ্নিত করতে পারবেন—এটা বোধ করি অত্যুক্তি নয়।

বইয়ের তথ্য

  • সুবর্ণপুরাণ
  • লেখক: পারভেজ হোসেন
  • প্রকাশক: সংবেদ
  • প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২২
  • প্রচ্ছদ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
  • পৃষ্ঠা: ২০৪
  • মূল্য: ৪০০ টাকা