পারস্য মহাকাব্য শাহনামার পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন লেখক ও অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ। তবে তার সাহিত্যকর্মের বিস্তার শুধু অনুবাদেই সীমাবদ্ধ ছিল না; জাতিগত স্বতন্ত্র ঐতিহ্যচেতনা ও মাটির প্রতি অঙ্গীকার তার সমগ্র সৃজনকর্মকে প্রভাবিত করেছে। শনিবার (৬ জুন) বাংলা একাডেমিতে লেখক ও অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ স্মরণে আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারের আয়োজন
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা একাডেমি আয়োজিত ‘সেমিনার সিরিজ ২০২৫-২০২৬’-এর অংশ হিসেবে এ স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় ‘বাংলার ফেরদৌসী মনিরউদ্দীন ইউসুফ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষক ড. হালিম দাদ খান। আলোচনায় অংশ নেন লেখক ও অনুবাদক জাভেদ হুসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লেখক ও আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন।
বক্তারা বলেন, বাংলা সাহিত্য ও জনপরিসরে মনিরউদ্দীন ইউসুফ প্রধানত শাহনামার অনুবাদক হিসেবে পরিচিত হলেও সাহিত্যের আরও নানা ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তার অনুবাদ ও মৌলিক রচনার পেছনে কাজ করেছে নিজস্ব ঐতিহ্যবোধ, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান এবং দেশের মাটির সঙ্গে গভীর সংযোগ।
উদ্বোধন ও অন্যান্য পর্ব
এর আগে সকালে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে সেমিনার সিরিজের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির গুণীজনদের জীবন ও কর্ম নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করতেই এ আয়োজন। তিনি বলেন, জীবনানন্দ দাশ, আল মাহমুদ, মনিরউদ্দীন ইউসুফ ও রশীদ করীম বাংলা সাহিত্যকে নানাভাবে ঋদ্ধ করেছেন এবং তাদের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
দ্বিতীয় পর্ব: আল মাহমুদ স্মরণ
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে কবি আল মাহমুদ স্মরণসভায় ‘কবিতাহীন সময়ে কবির কাল’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও সম্পাদক রেজাউল করিম রনি। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন কবি ও সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। সভা প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বক্তারা বলেন, আল মাহমুদ কবিতায় সময়ের মুখ অঙ্কন করেছেন। কবিতাহীন দুঃসময়কে কবিতাপ্রতিম মানবিক সময়ে উত্তরণের কথা উচ্চারণ করেছেন কারণ কবিতাহীন সময়ে কবির কাজ এমনই হওয়ার কথা। আল মাহমুদের কবিতায় লোকজীবনের যে অনুপম ছবি বাঙ্ময় হয়েছে দর্শনগত দিক দিয়ে তা সময় থেকে সময়াতীত ব্যঞ্জনায় ভাস্বর।
চতুর্থ পর্ব: জীবনানন্দ দাশ স্মরণ
চতুর্থ পর্বে কবি জীবনানন্দ দাশ স্মরণসভায় ‘জীবনানন্দ ও অন্ধকার’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও গবেষক কুমার চক্রবর্তী। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. কুদরত-ই-হুদা। সভা প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। বক্তারা বলেন, জীবনানন্দ দাশ কবিতা ও সামগ্রিক রচনাকর্মে আলো-আঁধারির চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন আজীবন। অন্ধকার তাঁর লেখায় কেবল রূপক হিসেবে আসেনি বরং অস্তিত্বের গাঢ় সংবেদ হিসেবে আলোর সঙ্গে হাত ধরাধরি করে উদ্ভাসিত হয়েছে।
পঞ্চম পর্ব: রশীদ করীম স্মরণ
পঞ্চম পর্বে বিকালে কথাসাহিত্যিক রশীদ করীম স্মরণসভায় ‘রশীদ করীমের উপন্যাস: মনস্কাত্ত্বিক আধুনিকতা নাগরিক চেতনা ও মুসলিম মধ্যবিত্ত জীবনের শিল্পরূপ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি ও গবেষক অধ্যাপক মাসুদুল হক। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক হোসনে আরা। সভা প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক। বক্তারা বলেন, রশীদ করীম বাংলা কথাসাহিত্যে সংযোজন করেছেন নতুন মাত্রা। তার স্বল্পসংখ্যক গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও স্মৃতিগদ্যে তিনি সতত স্বাতন্ত্র্য-সমুজ্জ্বল। তার উপন্যাসের দীর্ঘ ও হ্রস্ব ক্যানভাসে বাঙালি মুসলমানের শতাব্দীব্যাপী অভিযাত্রা উদ্ভাসিত হয়েছে। আমাদের নাগরিক জীবনের উন্মেষপর্ব তাঁর কথাসাহিত্যে বিশ্বস্ত স্বর খুঁজে পেয়েছে বললে অত্যুক্তি হয় না।
সেমিনার সিরিজের পর্বসমূহ সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সায়েরা হাবীব, উপপরিচালক ইমরুল ইউসুফ এবং সহপরিচালক ড. মাহবুবা রহমান।



