মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলায় বজ্রপাতে নিহত কিশোর আরাফাত খানের কবর পাহারা দিচ্ছে তার পরিবার। কঙ্কাল চুরির আশঙ্কায় দাফনের পর থেকেই তার বাবা নিজে এবং ভাড়া করা লোক দিয়ে কবর পাহারা দিচ্ছেন। এ অবস্থায় উপজেলা প্রশাসন গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দিয়েছে, যাতে মরদেহটি নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে কবরে থাকে।
ঘটনার বিবরণ
মৃত আরাফাত (১৭) উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের হাইয়ারপাড় এলাকার জসিম খানের ছেলে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টি হয়। সেদিন মাঠ থেকে গরুর জন্য ঘাস আনতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যায় আরাফাত। তাকে পার্শ্ববর্তী কামারখাড়া ইউনিয়নের কামারখাড়া সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় কামারখাড়া কবরস্থানে গিয়ে কবর পাহারায় কাউকে দেখা যায়নি। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে আরাফাতের বাবা জসিম খান কবর পাহারা দিতে এসেছিলেন। বুধবার বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কামারখাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবরস্থান পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁরা মরদেহটি নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে কবরে রাখার জন্য চারজন গ্রাম পুলিশকে দায়িত্ব দেন।
স্থানীয়দের ধারণা
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নানাভাবে ব্যবহৃত হয় এবং এগুলো উচ্চ মূল্যে বিক্রি করা যায়। এ কারণে একটি চক্র এমন মরদেহের খোঁজ পেলে কবরস্থান থেকে চুরি করে নিয়ে যায়। দাফনের পর থেকেই পরিবারের সদস্যরা পালা করে কবর দেখতে যেতেন এবং গভীর রাত পর্যন্ত পাহারা দিতেন।
কবরস্থানের পাশের বাসিন্দা মনির শেখ (৫৩) বলেন, ‘গত রোববার রাত সাড়ে তিনটার দিকে মাছ ধরতে যাচ্ছিলাম। তখন চার–পাঁচজন যুবককে গোরস্তানের রাস্তায় বসে থাকতে দেখি। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি, আরাফাতের কবর পাহারা দিতে জসিম খান তাঁদের পারিশ্রমিক দিয়ে ভাড়া করেছেন।’
পরিবারের বক্তব্য
চরাঞ্চলের হাইয়ারপাড় এলাকার নির্জন চিতাখোলা–সংলগ্ন স্থানে আরাফাতদের বাড়ি। বুধবার রাতে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎবিহীন একটি ভাঙা ঘরে তার স্বজনেরা বসে আছেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আরাফাতের বাবা জসিম খান ও মা সোনিয়া বেগম। আরাফাত তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয় সন্তান।
আরাফাতের বাবা জসিম খান বলেন, ‘আমার ছেলে ছোট মানুষ ছিল, তবু সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিল। দরজির কাজ আর একটি গরু দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাত। সেই ছেলেকে বজ্রপাতে আল্লাহ নিয়ে গেছে। ছেলেকে তো আর পাব না। দাফনের পর থেকে শান্তি পাচ্ছি না। বিভিন্ন জায়গায় বজ্রপাতে মৃতদেহ চুরির ঘটনা শুনেছি। যদি আমার ছেলের লাশ চুরি হয়ে যায়—এই ভয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রতি রাতে কবর পাহারা দিয়েছি। দিনের সময়ও আমরা পাহারা দেব।’
আরাফাতের মা সোনিয়া বেগম বলেন, ‘আরাফাতের বাবা অসুস্থ, সব সময় পাহারা দিতে পারেন না। ছেলে তো আল্লাহ নিয়েছেন, এখন যদি লাশটাও চুরি হয়ে যায়, তখন মনকে কীভাবে বোঝাব? তাই মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার করে শ্রমিক ভাড়া করে কবর পাহারা দিয়েছি। শুনেছি প্রশাসন এখন পাহারার ব্যবস্থা করেছে।’
প্রশাসনের পদক্ষেপ
লাশ চুরির আশঙ্কায় সন্তানের কবর পাহারা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। পরে পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য বুধবার ইউএনও তাহমিনা আক্তার কবরস্থান পরিদর্শন করেন।
ইউএনও বলেন, মরদেহ চুরি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বুধবার রাত থেকে চারজন গ্রাম পুলিশ দিয়ে কবরস্থানে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহ প্রতি রাতে দুজন করে পাহারা দেবেন। এরপর কবরস্থান কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। কবরস্থানটিকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।



