ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তেহরানের শত্রুপক্ষ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় খামেনি এবং তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হন।
লাখো মানুষের অংশগ্রহণ
ইরানি কর্তৃপক্ষের ধারণা, কেবল তেহরানেই আগামী তিন দিনে খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষ অংশ নেবেন। প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে ইরান শাসন করা ৮৬ বছর বয়সী খামেনির স্মরণে মোট ছয় দিনব্যাপী এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই নিহত হন।
শোক ও প্রতিশোধের আবহ
তেহরানের বিশাল গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সের প্রাঙ্গণে হাজার হাজার শোকাকুল মানুষ লাল ব্যানার হাতে খামেনির কফিনের জন্য অপেক্ষা করছেন, যা মূলত প্রতিশোধের প্রতীক। এ সময় সেখানে 'প্রতিশোধ, প্রতিশোধ' স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাতে শোকাকুল মানুষকে কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে আসতে হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই শত শত সমর্থক মোসাল্লার বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। সেখানে অপেক্ষারত সোমায়ে হামেদি বলেন, 'আমরা আমাদের নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে চাই, তাই এভাবে অপেক্ষা করা আমাদের জন্য বেদনাদায়ক বা কঠিন কিছু নয়।'
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সময়সূচি
অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ করার পাশাপাশি আকাশসীমাও বন্ধ রাখার কথা রয়েছে। ১৯৮৯ সালে খামেনির পূর্বসূরি রুহুল্লাহ খোমেনির দাফন অনুষ্ঠানের পর এটিই হতে যাচ্ছে ইরানের সবচেয়ে বড় গণ-জমায়েত। আগামী সোমবার পর্যন্ত খামেনির কফিন সর্বসাধারণের শ্রদ্ধার জন্য রাখা হবে এবং ওই দিন তেহরানের রাস্তায় শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গলবার মরদেহ নেওয়া হবে শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্র কোমে। এরপর বুধবার প্রতিবেশী ইরাকের শিয়া পবিত্র নগরীগুলোতে নিয়ে যাওয়ার পর আগামী বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদে খামেনির নিজ শহরে দাফন সম্পন্ন হবে।
শীর্ষ কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক উপস্থিতি
শুক্রবার খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসা ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আহমদ ওয়াহিদি। খামেনি নিহত হওয়া একই বিমান হামলায় রেভল্যুশনারি গার্ডসের সাবেক প্রধান নিহত হওয়ার পর ওয়াহিদিকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও এর আগে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। বাবার সঙ্গে একই হামলায় আহত হওয়া মোজতবা খামেনি কতখানি আঘাত পেয়েছিলেন, তা কখনই স্পষ্ট করা হয়নি। এ পর্যন্ত তিনি কেবল লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখায় আগামী দিনগুলোতে তার উপস্থিতির বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। ওই হামলায় নিহত খামেনির শিশু নাতনিসহ পরিবারের অন্য সদস্যদেরও এই সময়ে দাফন করা হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা
শুক্রবার আন্তর্জাতিক অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, তার দেশ বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে। এছাড়াও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষে হাজির ছিলেন রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমানে দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ। ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ গোষ্ঠী হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের প্রতিনিধিরাও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট
ছয় সপ্তাহের তীব্র লড়াইয়ের পর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রাথমিক চুক্তি হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজন হলে তেহরান আবারও লড়াইয়ে ফিরতে প্রস্তুত। স্পিকার গালিবাফ ইরানিদের দলে দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'জাতির প্রতিশোধের ডাক যেন পুরো বিশ্বের কান পর্যন্ত পৌঁছায়।' সেনাপ্রধান আমির হাতামিও প্রতিজ্ঞা করে বলেন, 'ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে শহীদ নেতা এবং জাতির সকল শহীদের রক্তের মূল্য দিতে হবে।'
নিরাপত্তা ও স্বস্তি
তবে অতীতে এ ধরনের বড় জমায়েতে হুড়োহুড়ির কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটায় এবার যেন সবকিছু নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, সেদিকে কর্তৃপক্ষের কড়া নজর রয়েছে। নিরাপদ থাকার উপায় নিয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নির্দেশিকাও প্রচার করা হচ্ছে। আগামী কয়েক দিন তেহরানের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকার পূর্বাভাস থাকায় সমবেতদের স্বস্তি দিতে রাস্তায় পানি ছিটানোর জন্য ট্যাংকার মোতায়েন করা হয়েছে।



