রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রায়শই বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন, শাসন মডেল, অর্থনৈতিক কৌশল এবং জাতীয় ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গঠিত হয়। ইতিহাসে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসা নেতারা দেশীয় নীতি কাঠামোতে নতুন ধারণা নিয়ে এসেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ভ্লাদিমির লেনিন ১৯১৭ সালে সুইজারল্যান্ড থেকে জার্মানি হয়ে রাশিয়ায় ফিরে বলশেভিক বিপ্লব পরিচালনা করেন এবং কমিউনিস্ট সংস্কার শুরু করেন, যা বিশ্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনে।
তারিক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা
তারিক রহমান ১৭ বছরের রাজনৈতিক নির্বাসন কাটিয়ে ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তার প্রত্যাবর্তনের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে তিনি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তার মালয়েশিয়া ও চীন সফর থেকে প্রাপ্ত অন্তর্দৃষ্টি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে কার্যকর উন্নয়ন দৃষ্টান্ত মূল্যায়ন ও স্থানীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োগযোগ্য শিক্ষা গ্রহণ করা যেতে পারে।
চীন ও মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক রূপান্তর
চীন এবং মালয়েশিয়া দুটি ভিন্ন কিন্তু অত্যন্ত সফল অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথ দেখিয়েছে। চীন সাম্প্রতিক ইতিহাসে দ্রুততম এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক রূপান্তরগুলোর একটি সম্পন্ন করেছে, যেখানে শতকোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, উৎপাদন ও প্রযুক্তিতে বিশ্বনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ইনভেস্টোপিডিয়ার মতে, চীনের অর্থনীতি নামমাত্র জিডিপিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম, যা প্রায় ২০.৮৫ ট্রিলিয়ান ডলার, যুক্তরাষ্ট্রের পরেই। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক্সের অনুমান অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার জিডিপি (পিপিপি) ২০২৫ সালের মধ্যে ১.৭৬৬ ট্রিলিয়ান ডলারে পৌঁছাবে এবং ২০২৬ সালের প্রাথমিক অনুমান ১.৮৩ ট্রিলিয়ান ডলার, যা বিশ্ব ব্যাংকের সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রায় ৪০% বেশি।
বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত অংশীদারিত্ব
বাংলাদেশ, চীন এবং মালয়েশিয়া গত কয়েক দশকে কৌশলগত অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে, বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে। আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে প্রায় ৭.০৭ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে প্রায় ৪.৪৫ বিলিয়ন ডলার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অধীনে প্রায় ৩৫টি বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ। অন্যদিকে, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য একটি প্রধান শ্রম রপ্তানি গন্তব্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১.২৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পায়, যা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৯%।
ডেং জিয়াওপিং থেকে শিক্ষা
ডেং জিয়াওপিং চীনের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃত। তার ১৯৭৮ সালে প্রবর্তিত সংস্কারগুলি বাজারমুখী নীতি, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের দিকে অর্থনীতিকে পরিচালিত করেছিল। শেনজেনের বিবর্তন কৌশলগত নগর ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। একসময়ের ছোট মাছ ধরার গ্রাম শেনজেন এখন প্রযুক্তি ও উৎপাদনের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদী নীতি বাস্তবায়ন, শক্তিশালী অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ধারাবাহিক উদ্ভাবন কাঠামোর মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে।
তারিক রহমান কি ডেং জিয়াওপিংয়ের সমতুল্য নেতৃত্ব দিতে পারবেন?
ডেং জিয়াওপিং এবং তারিক রহমানের মধ্যে তুলনা করার সময় তাদের রাজনৈতিক পরিবেশের প্রাসঙ্গিক পার্থক্য বিবেচনা করা জরুরি। ডেং চীনের সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর জটিলতার মধ্যে শাসন করেছেন, যেখানে বাংলাদেশ একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক গণতন্ত্র। তবে, স্থানান্তরযোগ্য নেতৃত্বের গুণাবলি যেমন ব্যবহারিকতা, কৌশলগত দক্ষতা, অভিযোজনযোগ্যতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি, মানবসম্পদে বিনিয়োগ এবং কার্যকর নেতৃত্ব - এগুলি ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে। তারিক রহমানের ভবিষ্যত সিদ্ধান্ত, নীতি উদ্যোগ, নেতৃত্বের পদ্ধতি এবং ভিন্ন রাজনৈতিক পরিবেশে ঐকমত্য গড়ে তোলার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে তিনি এই গুণাবলি ধারণ করতে পারেন কিনা।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ
বাংলাদেশ বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখা, রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ, শাসন কাঠামো উন্নত করা, শিক্ষার ফলাফল বৃদ্ধি, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন প্রচারের জন্য রাজনৈতিক দল, বেসরকারি খাত এবং সুশীল সমাজসহ সব খাতে দক্ষ নেতৃত্ব প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের বিভিন্ন শাসন মডেল ও সর্বোত্তম অনুশীলনের সংস্পর্শে এনে এই নেতৃত্ব বিকাশে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টেকসই উন্নয়ন অর্জনকারী দেশগুলি সাধারণত নির্বাচনী চক্রের বাইরে কৌশলগত লক্ষ্য অনুসরণ করে। অবকাঠামো, শিক্ষা, শিল্প নীতি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য ধারাবাহিকতা এবং দ্বি-দলীয় সমর্থন প্রয়োজন। মানবসম্পদে বিনিয়োগ অপরিহার্য। মালয়েশিয়া এবং চীন উচ্চশিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে যথেষ্ট তহবিল বরাদ্দ করেছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। স্থিতিশীল নিয়ম, দক্ষ জনপ্রশাসন, স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান এবং মানসম্পন্ন অবকাঠামো উদ্যোক্তা ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে।
ডিজিটাল রূপান্তর একটি মূল ক্ষেত্র। চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ই-কমার্স, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে বিশ্বনেতা, আর মালয়েশিয়া ধারাবাহিকভাবে তার ডিজিটাল অর্থনীতি প্রসারিত করছে। বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগের মাধ্যমে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবে ডিজিটাল অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং উদ্ভাবন ইকোসিস্টেমে ক্রমাগত বিনিয়োগ জাতীয় প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে।
একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন, যা উন্নয়ন উদ্যোগের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে এবং সময়মতো প্রকল্প সম্পাদন নিশ্চিত করবে। এই দলে প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞ প্রকল্প ব্যবস্থাপক থাকা উচিত। এছাড়া, চীন ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশ সরকারের সাথে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ গড়ে তুলতে পারে সৌরশক্তি সম্প্রসারণের জন্য। চীনের উন্নত সৌর প্রযুক্তি জ্ঞান স্থানান্তর এবং বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণে সহায়তা করতে পারে। সৌরচালিত বৈদ্যুতিক বাস ও যানবাহন উন্নয়ন নগর দূষণ কমাতে এবং পরিবহন দক্ষতা বাড়াতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাদেশকে চীনের সাথে রেল খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা করতে হবে, যা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ার বর্জ্য-থেকে-শক্তি প্ল্যান্টের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে; উভয় দেশের সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত যা পুনর্ব্যবহার, কম্পোস্টিং এবং বর্জ্য-থেকে-শক্তি প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করে।
যদি এই বৈশিষ্ট্যগুলি ভবিষ্যত নীতি-নির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে অর্জিত জ্ঞান কেবল ব্যক্তি নেতাদের জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন লক্ষ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে।
ডাঃ এ এস এম আনাম উল্লাহ (পিএইচডি) একজন সিনিয়র অস্ট্রেলিয়ান শিক্ষাবিদ, মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ওএইচএস ও শিল্প সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ।



