উমর খালিদের কারাজীবন: সূর্যাস্তের সময় সবচেয়ে কঠিন, দস্তয়েভস্কির কথা মনে পড়ে
উমর খালিদের কারাজীবন: সূর্যাস্তের সময় সবচেয়ে কঠিন

ভারতের রাজনৈতিক বন্দী উমর খালিদ জানিয়েছেন, দিল্লির তিহার জেলে সূর্যাস্তের সময়টাই সবচেয়ে কঠিন। বন্দী নম্বর ৬২৬৭১৪-এর মনের ভেতর আতঙ্ক দানা বাঁধে যখন হাজার হাজার বন্দীকে স্যাঁতসেঁতে উঠানে থাকতে বাধ্য করা হয়। সম্প্রতি তিনি জানতে পেরেছেন, ভারত থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে এক নির্বাসনশিবিরে থাকা আরেক রাজনৈতিক বন্দীও ১৫০ বছরের বেশি আগে একই অনুভূতি লিখেছিলেন। এটি তাকে নাড়া দিয়েছে।

দস্তয়েভস্কির সাথে মিল

২০২০ সালে জেলে যাওয়ার পর নিজের প্রথম সাক্ষাৎকারে খালিদ বলেন, ‘দস্তয়েভস্কিও তাঁর জেলের স্মৃতিচারণায় সূর্যাস্তের সময় এই মানসিক অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। আমার মনে হয়, সূর্যাস্ত হলেই মানুষ বুঝতে পারে যে তার জীবনের আরও একটি দিন বন্দিদশায় কেটে গেল।’

গ্রেপ্তার ও অভিযোগ

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে সন্ত্রাসী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। দিল্লির প্রাণঘাতী দাঙ্গার ‘মূল ষড়যন্ত্রকারী’ এবং ‘সহিংসতার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের’ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। টিভি চ্যানেলগুলো এখনো তাঁকে ‘মুসলিম সন্ত্রাসী’ বা ‘দেশদ্রোহী’ বলে আক্রমণ করে। অন্যদিকে বামপন্থী কর্মীরা তাঁর নাম মুখে নেন, তাঁর ছবি দেওয়া টি-শার্ট পরেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক প্রতীক

মানবাধিকারকর্মীদের কাছে উমর খালিদ মোদি সরকারের ভিন্নমত দমনের প্রতীক। ১২ বছর ধরে ক্ষমতাসীন বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীদের দমনে বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। খালিদ বিজেপির হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডার কড়া সমালোচক। তিনি অভিযোগ করেন, মোদি সরকার ভারতের ২০ কোটি মুসলমান ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন উসকে দিচ্ছে। তবে বিজেপি ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

কোনো বিচার ছাড়াই খালিদকে প্রায় ছয় বছর ধরে জেলে আটকে রাখাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো অন্যায় বলে নিন্দা জানিয়েছে। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি সংহতি জানিয়ে তাঁকে একটি হাতে লেখা চিঠি পাঠালে ভারত সরকার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। বিজেপির দাবি, ভারতের বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং খালিদের মামলার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই।

মানসিক চাপ

কারাগারের নিয়মের কারণে দ্য গার্ডিয়ান সরাসরি খালিদের সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। পরিবার ও বন্ধুদের মাধ্যমে প্রশ্ন পাঠিয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। ৩৮ বছর বয়সী এই যুবক বছরের পর বছর ধরে নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তবে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের মোকাবিলা করতে গিয়ে মানসিকভাবে ঠিক থাকা যে কতটা কঠিন, তা তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। খালিদ বলেন, ‘আপনাকে যখন ভালো বা খারাপ—যেকোনো একটা তকমায় আটকে দেওয়া হয়, তখন নিজের মানবিকতা ও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি যাঁরা আপনাকে সমর্থন করেন বা বড় নেতা হিসেবে তুলে ধরেন, তাঁরাও ভুলে যান যে আমিও একজন মানুষ। আমারও ভয়, দুর্বলতা আর খামতি আছে। এই দীর্ঘ কারাজীবন আমার শরীর ও মনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে এবং আমার ভেতরের উদ্বেগগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’

হিন্দুত্ববাদ নিয়ে ক্ষোভ

জেলে থাকলেও মোদি সরকারের প্রতি উমর খালিদের মনোভাব একটুও নরম হয়নি। তিনি বলেন, ‘ঘৃণা ও গণহত্যামূলক বক্তব্যকে যেভাবে স্বাভাবিক করা হচ্ছে এবং বাহবা দেওয়া হচ্ছে, তা দেখে আমি আতঙ্কিত। ভারতের সত্যোত্তর সমাজে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ।’

বি-মানবিকীকরণ

মামলার আইনি বিষয় বা তিহার জেলের ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে কথা না বলার শর্ত থাকলেও খালিদ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, চুপ থাকা কোনো সমাধান নয়। তিনি বলেন, ‘এমনকি একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করা সহবন্দীরাও আড়ালে আপনাকে “সন্ত্রাসী” বলে ডাকে। এই অপপ্রচার মানুষের চোখে আমার বি-মানবিকীকরণ ঘটায়। মানবিকতাও এক বিশেষ অধিকারে পরিণত হয়, যা আমার মতো মানুষের কপালে জোটে না।’

শৈশব ও ছাত্ররাজনীতি

দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির মুসলিমপ্রধান এলাকা জামিয়ানগরে বড় হওয়া খালিদ জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন কীভাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান সমাজকে ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভক্ত করেছে এবং মুসলমানদের অধিকার ও মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি এমন এক মুসলিম ঘেটোতে বড় হয়েছি, যেখানে মুসলমানরা ক্রমে নির্যাতনের শিকার, প্রান্তিক ও খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছিল। যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের পক্ষে এই পরিস্থিতি দেখে চুপ থাকা সম্ভব নয়।’

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) পিএইচডি করার সময় খালিদ সেখানকার ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন ডানপন্থীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তখন তিনি লাইমলাইটে চলে আসেন। ২০১৬ সালে জেএনইউর একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর খালিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ ও দেশের জন্য হুমকি হিসেবে প্রচার করতে থাকে। খালিদ বলেন, ‘এর পর থেকে আমার জীবন আর আগের মতো রইল না।’ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এমনকি তাঁর পিএইচডি থিসিস জমা দিতেও বাধা দিয়েছিল, যা পরে তিনি হাইকোর্টের মাধ্যমে আদায় করেন। এ মাসেই তাঁর সেই গবেষণা ‘ফ্র্যাকচার্ড কমিউনিটিজ’ নামে বই আকারে প্রকাশ পাবে।

২০১৯ সালের আন্দোলন

২০১৯ সালে সরকারের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালিদ অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। এই আইনকে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক হিসেবে দেখা হচ্ছিল। জেএনইউ ক্যাম্পাস হয়ে ওঠে আন্দোলনের মূল কেন্দ্র। পরে লাখ লাখ মানুষ ভারতের বিভিন্ন শহরের রাস্তায় নেমে আসে। এটা ছিল মোদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

আন্দোলনের এক বিখ্যাত ভাষণে খালিদ জনতাকে বলেছিলেন, ‘আমরা সহিংসতার জবাব সহিংসতা দিয়ে দেব না। ঘৃণার জবাব ঘৃণা দিয়ে দেব না। তারা ঘৃণা ছড়ালে আমরা ভালোবাসা দিয়ে তার জবাব দেব।’

দিল্লি দাঙ্গা ও গ্রেপ্তার

রাষ্ট্র এর জবাবে কঠোর অবস্থান নেয়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশি হামলা চলে এবং বিজেপির নেতারা উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে থাকেন। এর ফলে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লিতে ভয়াবহ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া গুজবের জেরে হিন্দু দাঙ্গাকারীরা রাজধানীজুড়ে তাণ্ডব চালায়, মসজিদ ভাঙচুর করে এবং মুসলিমদের ওপর হামলা চালায়। তিন দিন ধরে চলা এই সংঘাতে ৫৩ জন নিহত হন, যাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন মুসলিম। কিন্তু দিল্লি পুলিশ যখন চার্জশিট দাখিল করে, তখন বিজেপির কোনো নেতার নাম সেখানে ছিল না। অথচ দাঙ্গার সময় এক হাজার মাইল দূরে থাকা খালিদকে এই দাঙ্গার ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।

খালিদের সঙ্গে আরও এক ডজনের বেশি মানবাধিকারকর্মী ও ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ ছিল, তাঁরা নাকি ‘সশস্ত্র বিদ্রোহের’ মাধ্যমে ‘দেশের ওপর পূর্বপরিকল্পিত হামলা’র সমন্বয় করতে ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছিলেন’। খালিদ এ অভিযোগগুলোকে ‘ডিস্টোপিয়ান’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু এর সাত মাস পর দিল্লির পুলিশ কর্মকর্তারা দেশের সবচেয়ে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় তাঁকে দিল্লির পারিবারিক বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করেন।

জামিন না পাওয়া

এ মামলার অন্য আসামিরা জামিন পেলেও খালিদের জামিন বারবার আটকে যাচ্ছে। বিচারকেরা একের পর এক শুনানির তারিখ পিছিয়ে দিচ্ছেন বা মামলা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন। বিজেপি এই মামলায় কোনো হস্তক্ষেপের কথা অস্বীকার করলেও খালিদের জামিন বাতিলের সিদ্ধান্তকে সব সময় স্বাগত জানিয়েছে। বারবার মুক্ত হওয়ার আশা ভঙ্গ হওয়াকে ‘অত্যন্ত হৃদয়বিদারক’ বলে উল্লেখ করেন খালিদ। তিনি বলেন, ‘ধীরে ধীরে আশার আলো নিভে যেতে থাকে। আর আশা ছাড়া কারাগারে টিকে থাকা অসম্ভব রকম কঠিন—এটি মানসিক ও শারীরিকভাবে আপনাকে ভেঙে চুরমার করে দেবে।’

বিরোধী দলের নীরবতা

বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের কারাগারগুলোয় রাজনৈতিক বন্দীদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু তাঁদের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে ব্যর্থ বিরোধী দলগুলোর প্রতি খালিদ তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘ছয় বছর পর আজ আমি সত্যিই হতাশ এবং নিজেকে খুব একা মনে হয়। বিরোধী দল, সুশীল সমাজ কিংবা যেসব সেলিব্রিটি অ্যাকটিভিস্ট জনগণের আন্দোলনকে পুঁজি করে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়েছেন, তাঁদের এই নীরবতা বর্তমান সরকারকে আরও সাহসী করে তুলছে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের জন্য।’

কারাগারে সান্ত্বনা

খালিদ কেবল রাতের বেলাতেই কিছুটা শান্তি পান। যখন তাঁকে সেলের ভেতর আটকে দেওয়া হয় এবং প্রহরীর চাবির আওয়াজ মিলিয়ে যায়, তখন নিজের ডায়েরি থেকে দেয়ালের গায়ে লিখে রাখা কিছু উক্তি তাঁকে সান্ত্বনা দেয়। ভারতের বিপ্লবী ভগত সিংয়ের ছবির পাশে খালিদ লিখে রেখেছেন সেই বিখ্যাত উক্তিও: ‘আমি সেই খ্যাপা আত্মা, যে বন্দিদশাতেও স্বাধীন।’

হ্যানা এলিস-পিটারসেন দ্য গার্ডিয়ানের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রতিনিধি। দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ।