ময়মনসিংহের গৌরীপুরে উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি মানিক মিয়াকে (৪০) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুনশীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই ঘটনায় ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের সদস্য ও উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আল ইমরান খান এবং গৌরীপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিফাত হাসানকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
বহিষ্কারের কারণ ও প্রক্রিয়া
জনবিরোধী নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শোয়েব মুনশীকে যুবদলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কেন্দ্রীয় যুবদলের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে কেন্দ্রীয় যুবদলের নির্বাহী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (দপ্তরের দায়িত্ব) মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বহিষ্কৃতদের কোনো ধরনের অপকর্মের দায়-দায়িত্ব দল নেবে না। যুবদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়ন এমপির সিদ্ধান্তে এ আদেশ কার্যকর করা হয়।
শোয়েব মুনশীর বক্তব্য
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুন্সী সাংবাদিকদের বলেন, তিনি এ বিষয়টি শুনেছেন এবং এ ঘটনায় তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি দাবি করেন, ওদের মাদক সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল এবং মাদক ব্যবসার কারণেই এ ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমি গৌরীপুর পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। একটি মহল ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা-ভিত্তিহীন অপবাদ ছড়াচ্ছে।
ছাত্রদল নেতাদের বহিষ্কার
একই দিনে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের সদস্য ও উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আল ইমরান খান এবং গৌরীপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রিফাত হাসানকে বহিষ্কার করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক মো. সাদ্দাম হোসেন তালুকদার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নুরুজ্জামান সোহেল বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, শ্রমিক নেতা মানিক হত্যার অভিযোগে ছাত্রদলের দুই নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
হত্যার বিবরণ ও মামলা
পৌর শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকার আজিবুল ইসলামের পুত্র সুখ মিয়া (নিহতের ভাই) জানান, তার ভাই মানিক মিয়া মঙ্গলবার দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় কয়েল আনতে গেলে ময়মনসিংহ উত্তর জেলা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক শোয়েব মুনশীর নেতৃত্বে ১৪-১৫ জন মিলে তাকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর দফায় দফায় তাকে প্রহার-নির্যাতন ও পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। রাতে তার লোকজন এসে মানিকের স্ত্রীকে খবর দেয় এবং তার ছেলেকেও নিয়ে যেতে বলে। তখন শুধু মানিকের স্ত্রী সেখানে যায় এবং তাকেও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। রক্তাক্ত স্বামীকে চিকিৎসা নিতে হলে আগে যা বলবে তা বলতে বাধ্য করা হয়। তিনি আরও জানান, তাদের সঙ্গে জমিসংক্রান্ত বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে চলছে এবং মূলত জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই তার ভাইকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
স্বামী মানিক মিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে তার স্ত্রী মোছা. সুমাইয়া আক্তার সেলিনা বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতে গৌরীপুর থানায় মামলা করেছেন।
নিহতের ছেলের পরীক্ষা
মানিক মিয়ার লাশ কবরে রেখে বৃহস্পতিবার এইচএসসির বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষায় অংশ নেয় তার ছেলে আদিব মাহমুদ আলিফ। গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে তিনি এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। তাকে এগিয়ে দিতে এসে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। চোখের পানি মুছতে মুছতে পরীক্ষা কক্ষে প্রবেশ করলেও নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগেই তিনি বেরিয়ে যান। চোখের পানিতে ভিজে যাওয়া রুমাল রয়ে গেছে তার সেই টেবিলে।



