শেরওয়ানি ফেলে আসায় ফ্লাইট থামানোর নির্দেশ
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রামগামী এয়ার অ্যাস্ট্রার ফ্লাইট ২এ-৪১৫ উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কেবিন ক্রু নিরাপত্তা ঘোষণা শেষ করলে যাত্রীরা সিটবেল্ট বেঁধে অপেক্ষা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে এক যাত্রী দাবি তোলেন, ফ্লাইট থামাতে হবে—কারণ তিনি বাসায় শেরওয়ানি ফেলে এসেছেন।
পরিচয়পত্র দেখিয়ে চাপ সৃষ্টি
কেবিন ক্রু তাকে জানান, জরুরি চিকিৎসা বা নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি ছাড়া ট্যাক্সিওয়ে থেকে বিমান ফিরিয়ে আনার নিয়ম নেই। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই যাত্রী নিজেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফার্স্ট অফিসার বলে পরিচয় দেন এবং অফিসিয়াল আইডি কার্ড দেখিয়ে বিমান থামানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। শেষ পর্যন্ত ট্যাক্সিওয়ে থেকে ফ্লাইটটি টার্মিনালে ফিরিয়ে আনা হয়, যা প্রায় ১০০ যাত্রীর জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়।
বিমানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, “এটি খুব গুরুতর ঘটনা। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি বিষয়টির খোঁজখবর নিচ্ছি। তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ঘটনায় এয়ার অ্যাস্ট্রা এবং সংশ্লিষ্ট বিমানের পাইলট উভয়কেই তদন্তের আওতায় আনা হবে।” তিনি আরও বলেন, যাত্রী হয়রানির বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
আইকাও বিধি ও নিরাপত্তা প্রটোকল লঙ্ঘন
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) বিধি অনুযায়ী, গুরুতর জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া ট্যাক্সিওয়ের পর বিমান ফিরে আসার সুযোগ নেই। কোনো যাত্রী মাঝপথে নেমে গেলে নিরাপত্তার স্বার্থে ওই যাত্রীর সব লাগেজ বিমান থেকে নামিয়ে পুনরায় নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে হয়। অভিযোগ উঠেছে, একজন কর্মকর্তার পরিচয়পত্রের প্রভাবের কারণে এয়ার অ্যাস্ট্রা এসব নিরাপত্তা প্রটোকল লঙ্ঘন করেছে।
বিশেষজ্ঞের মন্তব্য
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, “গুরুতর চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা, নিরাপত্তার হুমকি, যান্ত্রিক ত্রুটি বা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের নির্দেশ ছাড়া বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ট্যাক্সিওয়ে থেকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। কোনো যাত্রীর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বিমান ফিরিয়ে আনা হলে সেটি অপারেশনাল সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা প্রটোকল এবং পেশাগত নৈতিকতা—এ তিন ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তৈরি করে।” তিনি আরও বলেন, সরকারি পরিচয় বা পদমর্যাদার প্রভাব খাটিয়ে যাত্রী নিরাপত্তা হুমকি তৈরির কারণে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
যাত্রীদের ভোগান্তি ও ক্ষতিপূরণের দাবি
ফ্লাইটে থাকা যাত্রী আফসানা সুলতানা যুগান্তরকে বলেন, “আমার জরুরি প্রয়োজনে দুপুর ১২টার মধ্যে চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা ছিল। সে অনুযায়ী সময় বিবেচনা করেই টিকিট কেটেছিলাম। কিন্তু ওই ব্যক্তির খামখেয়ালিপনা ও ক্ষমতার দাপটে আমার মতো পুরো বিমানের যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। যে কাজের জন্য চট্টগ্রামে যাচ্ছিলাম, সেটিই আর করতে পারিনি। এখন এ ক্ষতির দায় কে নেবে?” তিনি এয়ার অ্যাস্ট্রা ক্ষতিপূরণ না দিলে ভোক্তা অধিকারে মামলা করার কথা জানান।
সূত্র জানায়, যাত্রীদের প্রায় তিন ঘণ্টা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হয়। শেরওয়ানি এনে পুনরায় বিমানবন্দরে ফেরার পর দুপুর প্রায় ১টার দিকে ফ্লাইটটি চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলেও যাত্রীদের জন্য এয়ার অ্যাস্ট্রার পক্ষ থেকে ন্যূনতম খাবার বা পানীয়ের ব্যবস্থা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন একাধিক যাত্রী।
তদন্তের দাবি
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, “একজন যাত্রী—তিনি অন্য একটি এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা হলেও এ ফ্লাইটে সাধারণ যাত্রী ছিলেন। হট্টগোল করলেই পাইলট কেন বিমান ফিরিয়ে আনলেন—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, পাইলট ইন কমান্ড এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যাত্রী’ হিসেবে রিপোর্ট করেছিলেন কিনা, নাকি সহকর্মী পাইলটের পরিচয়ের কারণে প্রচলিত প্রটোকল লঙ্ঘন করা হয়েছে, সেটিও তদন্ত করে দেখা দরকার।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, “যাত্রীদের কিছুটা দুর্ভোগ হয়েছে, সেটি আমরা অস্বীকার করছি না। তবে কোনো যাত্রী অভিযোগ করলে এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”



