পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের চরম বিপর্যয়ের পর দলীয় সংকট আরও গভীর হয়েছে। দলের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একের পর এক ধাক্কা সামলাতেও নিজের অনমনীয় মনোভাব বজায় রেখেছেন। দলের অধিকাংশ বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আলাদা দল গঠন করার এবং লোকসভা সাংসদদের একটি তৃতীয় ব্লক তৈরি করে ‘আসল তৃণমূল কংগ্রেস’ দাবির লড়াই শুরু করার পর, রাজনৈতিক বিরোধীদের তীব্র চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন মমতা।
মমতার হুঙ্কার: থামাতে হলে হত্যা করতে হবে
তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাকে থামাতে হলে বিরোধীদের তাকে হত্যা করতে হবে। দলীয় বিদ্রোহীদের বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের এই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, তৃণমূলের প্রতীক তার এবং তার প্রতি অনুগত শিবিরের কাছেই থাকবে। মমতার এমন অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই প্রতীক নিয়ে বিদ্রোহীদের একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। দলীয় প্রতীক কোথাও যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমাকে থামাতে হলে তোমাদের আমাকে মেরে ফেলতে হবে।'
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগ ও বিদ্রোহীদের তৎপরতা
শনিবার (৪ জুন) তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান আরও একটি বড় ধাক্কা খান, যখন তার প্রতি অনুগত অন্যতম শীর্ষ নেত্রী ও দলের রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরে চন্দ্রিমাকে দেখা যায়, যাদের সমর্থকরা গত শুক্রবার কলকাতার তৃণমূলের মূল কার্যালয় দখল করে নিয়েছিল।
চন্দ্রিমার পদত্যাগ প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য আগেই তাকে বাস্তব পরিস্থিতি এবং তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন, কারণ চন্দ্রিমার ছেলেও এর আগে তৃণমূল বিরোধী শিবিরের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। তবে বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে আসা কোনো উপদেষ্টা পদের প্রস্তাব তিনি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তিনি কখনোই বিদ্রোহীদের সঙ্গে হাত মেলাবেন না। তৃণমূল নেত্রীর দাবি, মূলত চাপের মুখেই বিদ্রোহীরা দল ছেড়ে চলে গেছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, 'আমি বা আমার দল বিজেপির কোনো চাপের কাছে মাথা নত করব না।'
দলীয় কার্যালয় দখলের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া
গত শুক্রবার তৃণমূলের কার্যালয় দখল এবং সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনারও তীব্র সমালোচনা করেন মমতা। তিনি বলেন, 'যারা গতকাল তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়ে গিয়ে তালা লাগিয়েছিল, তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই—আমরা ওই অফিসটি ভাড়া নিয়েছিলাম এবং ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আমাদের লিজ রয়েছে। কোনো ব্যক্তি দল ছাড়তেই পারেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে দল নামক প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এটি দলের সম্পত্তি, আমি বা অন্য কেউ জোর করে 'মা, মাটি, মানুষ'-এর এই সম্পত্তি দখল করতে পারে না।'
তৃণমূলের আদর্শ ও বিজেপি-বিরোধী অবস্থান
২০১১ সালে সাড়ে তিন দশকের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা এই নেত্রী মনে করিয়ে দেন, তৃণমূলের আদর্শ পুরোপুরি বিজেপি বিরোধী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, 'এই প্রতীক আমার দেওয়া। ২০২৬ সালের নির্বাচনে আমিই আপনাদের মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করেছিলাম। নির্বাচনের মাত্র দুই মাসের মধ্যে আপনারা কীভাবে এমন বিশ্বাসঘাতক হলেন? সব কিছুর একটা সীমা থাকা উচিত। আপনারা এখন বিজেপির সাথে আছেন, কিন্তু তৃণমূলের বিজেপি-বিরোধী আদর্শের কারণে এটা এভাবে চলতে পারে না।'
নতুন সদর দপ্তর ও দলীয় ভাঙনের মাত্রা
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের বিদায়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, তিনি নিজেই এখন জাতীয় ও রাজ্য স্তরে দলের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিচ্ছেন এবং তার কালীঘাটের বাসভবনে অবস্থিত কার্যালয়টিই এখন থেকে তৃণমূলের মূল কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হবে। উল্লেখ্য, রাজ্য নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর থেকেই দলে এই ভাঙন শুরু হয়, যেখানে বিদ্রোহীরা মমতার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ইতোমধ্যে ৬০ জনেরও বেশি বিধায়ক এবং ২০ জনেরও বেশি লোকসভা সাংসদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দল থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। পদত্যাগের পর চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা থাকবে, তবে দলে পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার অভাবের কারণেই তিনি এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
সূত্র: এনডিটিভি।



