গণ-অভ্যুত্থান ও সংস্কার: আসিফ মোহাম্মদ শাহানের সাক্ষাৎকার
গণ-অভ্যুত্থান ও সংস্কার: আসিফ মোহাম্মদ শাহানের সাক্ষাৎকার

আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেছেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছে এবং বিএনপি সরকার জবাবদিহি নিশ্চিত করেনি, যা ভবিষ্যতে সংকট ডেকে আনবে। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংস্কার প্রক্রিয়া এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত মতামত দেন।

গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন ও ব্যর্থতা

আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, ঐতিহাসিকভাবে কোনো গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লব তার আগের সব আকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না। অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক শক্তি ও গোত্রের উত্থান ঘটে, যারা মূল আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা থেকে বাইরে চিন্তাভাবনা করে। বাংলাদেশও সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অবসান এবং দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়া দেশকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটানো। তবে ব্যর্থতার পাল্লাও ভারী। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান, যেমন সংসদের ভূমিকা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী ও কার্যকর করা হয়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের বিপদ

তিনি বলেন, বর্তমানে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করছে ২০৩০ বা ৩১ সালে আরেকটি নির্বাচন পাওয়ার প্রত্যাশার ওপর, অর্থাৎ আমরা নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্রের মধ্যে থেকে যাচ্ছি। ১৯৯১ সালেও এই নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র দেখা গেছে, যা প্রতিষ্ঠান দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত না হলে একটি সময় পর অর্থহীন হয়ে পড়ে। কারণ তখন কোনো ব্যক্তি বা দল অগণতান্ত্রিক হবে না, এমন বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করতে হয়। যদি প্রতিষ্ঠানগুলো বাধা দিতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্তর্বর্তী সরকারের সংকট ও সংস্কার প্রক্রিয়া

আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়টিতে বেশ কিছু সংকট ছিল। কিছু গোষ্ঠী মনে করেছিল, তারাই গণ-অভ্যুত্থান করেছে এবং সবকিছু তাদের কারণেই হয়েছে। এই ভাবনা থেকে তারা জোরজবরদস্তি করে অনেক কিছু বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সমালোচনার জায়গা হলো, তারা এখানে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পরও সেই গোষ্ঠীগুলোকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা বা মব সহিংসতাকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো নমুনা এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।

গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান বক্তব্য ছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু অন্তর্ভুক্তির সেই জায়গা থেকে আমরা অনেক দূরে সরে এসেছি। সমাজের অনেক অংশকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যেমন নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং লিবারেল স্বরগুলো নানাভাবে আক্রান্ত হয়েছে।

এলিট পরিচালিত সংস্কার প্রক্রিয়া

সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি এলিট পরিচালিত হয়ে গেছে। সংস্কারের শুরুর দিকে জনগণের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হলেও, কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে ঐকমত্য কমিশন বসলে জনগণের কাছে গিয়ে দর-কষাকষির বিষয় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়নি। এই ব্যর্থতার দায় তিনি অন্তর্বর্তী সরকার ও নাগরিক সমাজকে দেন।

উদাহরণ হিসেবে উচ্চকক্ষের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পিআর পদ্ধতির সঙ্গে জনগণের জীবনের সমস্যার সম্পর্ক বোঝানো হয়নি। দুদক বা মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন হলে বা পুলিশের সংস্কার হলে জনগণের জীবনে কী পরিবর্তন হবে, তা-ও বলা হয়নি। ফলে সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনগণ তাদের মালিকানা খুঁজে পায়নি।

সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে জনগণ বাদ পড়ায় শেষ পর্যন্ত সেটি রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার বিষয় হয়ে ওঠে। বিএনপি জানত যে নির্বাচনে গেলে তারাই ক্ষমতায় আসবে এবং তারপর তারা তাদের মতো করে সংস্কার সাজাতে পারবে। এখানে একটি অসম দর-কষাকষি হয়েছে, যেখানে বিএনপির শক্তির জায়গা বেশি ছিল। এই অসম দর-কষাকষিতে সমতা আনার উপায় ছিল জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ, যা ঘটেনি।

বিএনপি সরকারের পাঁচ মাস

বিএনপি সরকারের পাঁচ মাস মূল্যায়ন করে আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, বিএনপির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও রূপরেখা পরিষ্কার, কিন্তু একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র যে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তা আমরা আওয়ামী লীগের সময়ে দেখেছি। অর্থনৈতিক রূপরেখা সমর্থন করে এমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিএনপি তৈরি করছে না। এটি ভবিষ্যতের জন্য বড় সংকট, কারণ সুশাসন ও জবাবদিহির সমস্যা হলে কর্মসূচির ফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না।

সংস্কারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

নতুন সরকারের প্রথম অধিবেশনে বিচার বিভাগ, দুদক, মানবাধিকার কমিশনের মতো মৌলিক সংস্কার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি অপরিবর্তিত অবস্থায় পাস হয়েছে, কিন্তু জবাবদিহি নিশ্চিত করার অধ্যাদেশগুলোর বড় অংশ বিএনপি বাতিল বা স্থগিত করেছে অথবা সংশোধন করে অকেজো করে দিয়েছে।

আমলাতন্ত্রের শক্তিশালীকরণ

আমলাতন্ত্রের সংস্কার সম্পর্কে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে আমলাতন্ত্র আরও শক্তিশালী হচ্ছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ হয়নি, যা প্রশাসনে অসন্তোষ তৈরি করছে। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানোর ভালো উদ্যোগ নিলেও ইউএনও-র ওপর সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে জবাবদিহি ছাড়াই আমলাতন্ত্রকে শক্তিশালী করা হচ্ছে।

নাগরিক সমাজের ভূমিকা

নাগরিক সমাজের দ্বিধাগ্রস্ত ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, নাগরিক সমাজকে শক্ত অবস্থান নিতে হবে এবং নিজের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নাগরিক সমাজের বড় অংশ চুপ ছিল, যা অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তাদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এখন বিএনপির কর্মকাণ্ড যদি গণতান্ত্রিক নীতি লঙ্ঘন করে, তাহলে নাগরিক সমাজকে শক্ত আওয়াজ তুলতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে ডানপন্থা সবকিছুর দখল নিয়ে বসবে।

ডানপন্থার উত্থান ও রাজনৈতিক ট্রাইবালিজম

ডানপন্থার উত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি হঠাৎ হয়নি, বরং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই শুরু হয়েছে। এখন রাজনৈতিক ট্রাইবালিজম বা গোত্রতন্ত্র তৈরি হয়েছে, যেখানে ভিন্নমতকে শুধু অগ্রাহ্য নয়, শত্রু হিসেবে দেখা হয়। ডানপন্থী ট্রাইবালিজম বাড়ছে এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্তরাও এতে অংশ নিচ্ছে। ফলে সমাজে বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের হিসাব-নিকাশে ডানপন্থা ঠেকাতে পারছে না। জামায়াতের জন্য ডানপন্থার বিস্তার লাভজনক, এনসিপি জামায়াতের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিচ্ছে না, আর বিএনপির বড় ভোট ডানপন্থী ভোটারদের কাছ থেকে আসে। ফলে পুরো রাজনৈতিক ডিসকোর্স ডান দিকে সরে যাচ্ছে।

ট্রাইবালিজম থেকে বেরিয়ে আসার পথ

রাজনৈতিক ট্রাইবালিজম থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনি তিনটি পথের কথা বলেন। প্রথমত, রাজনৈতিক আলোচনাকে মধ্যপন্থী বা বাম পরিসরে আনা এবং ব্যক্তিগত অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া। দ্বিতীয়ত, নাগরিক সমাজকে সহিষ্ণুতা ও রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়াতে কাজ করা। তৃতীয়ত, লিবারেল জায়গায় শূন্যতা পূরণে নতুন রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলোকে এক হয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে।