ভারতবিদ্বেষ বনাম ভিসা আবেদনের বিপুল ধুম: এক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ভারতবিদ্বেষ বনাম ভিসা আবেদনের ধুম: মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

২০২৫ সালের ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা খোলার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পাঁচটি কেন্দ্রে জমা পড়েছে এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি আবেদন। সার্ভার ডাউন হয়ে গিয়েছিল এত চাপে। অথচ এর আগে 'দিল্লি না ঢাকা' স্লোগানে রাজপথ কাঁপানো, ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দেওয়া, ভারতে না যাওয়ার প্রতিজ্ঞা—সবই যেন ভুলে গেছেন অনেকে। এই বৈপরীত্যে রীতিমতো লজ্জিত হচ্ছেন লেখক, যিনি একজন মনোবিজ্ঞানী।

ভিসা খোলার পর হুমড়ি খাওয়া: সংখ্যার ভাষা

লেখক জানান, তার ছেলে দার্জিলিং পড়ে, তাই ২০২৩ সাল থেকে তাকে নিয়মিত ভারত যেতে হয়। তিনি বলেন, 'ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারাও অবাক হয়েছেন, কখনও ছেলেকে স্কুলে রেখে পরদিনই ফিরে এসেছি।' ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় গিয়ে তিনি দেখেন, নিউ মার্কেট ফাঁকা, হোটেল ফাঁকা, ব্যবসায় মন্দা। বর্ডার দিয়েও এখন দিনে ১০/১২ জন পারাপার হন, আগে হাজার হাজার হতেন। গাড়িচালকরা বেকার।

অথচ দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনে ২০২৪-২৫ সালে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের প্রায় এক হাজার কোটি রুপি ক্ষতি হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে তাদের মধ্যে বড় ক্ষোভ দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত বারবার বলেছে, নির্বাচিত সরকার এলেই সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রায় দুই মাস পর ভারতীয় দূতাবাসের ১৮তম হাইকমিশনার হিসেবে এলেন দীনেশ ত্রিবেদী, আর ভিসা খুলে দেওয়া হলো।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রশ্ন: এ কেমন মানসিকতা?

লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, 'এখন আমার প্রশ্ন, এটা কী হলো ভাই? অল্প কিছু দিন আগেও আপনারা দিল্লি না ঢাকা স্লোগান দিয়ে রাজপথ কাঁপিয়েছেন, ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছেন, ভারতে যাবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন। এখন এমনভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়তে হলো কেন, যাতে তাদের সার্ভারই ডাউন হয়ে গেলো?' তিনি বলেন, ২০২৩ সাল থেকে ফেসবুকের গ্রুপে ভিসা সংক্রান্ত আপডেট জানতেন, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভারতকে তুলোধুনা করা স্ট্যাটাস ও কমেন্ট দেখতেন। এই বৈপরীত্য দেখে তিনি লজ্জিত।

লাভ-হেইট রিলেশনশিপ ও জ্ঞানগত দ্বন্দ্ব

সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের আচরণকে 'লাভ-হেইট রিলেশনশিপ' বলা হয়। মানুষ ভারতের নীতি বা সরকারের একপাক্ষিক আচরণের বিরোধী হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ভারতের সুযোগ বেছে নিতে দ্বিধা করে না। মনোবিজ্ঞানে একে 'জ্ঞানগত দ্বন্দ্ব' বলা হয়—একই সঙ্গে দুটি পরস্পরবিরোধী বিশ্বাস ধারণ করা। কেউ বলে, সরকারকে অপছন্দ করি, দেশটাকে নয়; কেউ বলে, যাওয়ার প্রয়োজন আছে, কিন্তু সমর্থন করি না।

সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব ও ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট

সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের আবেগকে তীব্র করে তোলে। অনলাইনে মানুষ এমন ভাষা ব্যবহার করে, যা বাস্তব জীবনে করতো না—একে 'আত্মসংযম শিথিল হওয়ার প্রবণতা' বলা হয়। স্ট্যাটাস বা কমেন্ট বক্সে যে ভারতবিদ্বেষ চোখে পড়ে, বাস্তব জীবনে সেই মানুষটিই ভিসার আবেদন করছেন। এছাড়া 'দিল্লি না ঢাকা' স্লোগানে অনেকেই 'ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্টে' স্রোতে গা ভাসায়, কিন্তু উন্মাদনার মেঘ কেটে গেলেই ব্যক্তিগত স্বার্থ ও যুক্তিবোধে ফিরে আসে।

হীনম্মন্যতা ও নির্ভরশীলতার লজ্জা

লেখক মনে করেন, ভারত বড় দেশ, সুযোগ-সুবিধা বেশি। আমরা অবচেতন মনে 'ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স বা হীনম্মন্যতায়' ভুগি। চিকিৎসা, শিক্ষা বা বিনোদনের জন্য অন্য বড় দেশের ওপর নির্ভর করতে হলে আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে। নির্ভরশীলতার লজ্জা ঢাকতে মানুষ বিদ্বেষমূলক আচরণ করে—এটা নিজের দুর্বলতাকে আড়াল করার মনস্তাত্ত্বিক ঢাল।

রাজনৈতিক কার্ড ও ভৌগোলিক বাস্তবতা

বাংলাদেশে ভারত-বিরোধিতা ভোটের রাজনীতিতে জনপ্রিয় 'কার্ড'। বিগত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ক্ষোভের বড় অংশ গিয়েছিল দিল্লির ওপর। 'দিল্লি না ঢাকা' স্লোগান সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রতীকী লড়াই ছিল, কোনো ভারতীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতা—যশোরের মানুষের কাছে ঢাকার চেয়ে কলকাতায় চিকিৎসা সাশ্রয়ী, পঞ্চগড়ের মানুষের কাছে কক্সবাজারের চেয়ে দার্জিলিং সহজ। এই সত্যকে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান মুছে ফেলতে পারে না।

প্রয়োজনের কাছে আবেগের পরাজয়

হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা ভারতের ওপর নির্ভরশীল। সমাজবিজ্ঞানের যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ শেষ পর্যন্ত লাভজনক সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনৈতিক অবস্থান ও আবেগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা বা সন্তানের ভবিষ্যতের প্রশ্ন এলে লাভ-ক্ষতির বাস্তব হিসাবই অগ্রাধিকার পায়।

দুদেশের সম্পর্ক এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি—অবৈধ অভিবাসন, সীমান্ত হত্যা, নদীর পানিবণ্টন ইস্যুতে। তারপরও ভিসা চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপুল আবেদন মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতি রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রয়োজনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ভারতবিরোধিতা একটি রাজনৈতিক ও আবেগীয় অবস্থান, কিন্তু ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুই দেশের মানুষ পরস্পর নির্ভরশীল। আমরা ক্ষোভ দেখাই সামষ্টিক আবেগে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিই ব্যক্তিগত প্রয়োজনে। রাজনীতির স্লোগান দিয়ে ক্ষণিকের জন্য বুক ফোলানো যায়, কিন্তু দিনশেষে মানুষ বাস্তবতার কাছেই নতজানু হয়।