ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি—এই দুই শীর্ষ আলোচককে ইসরায়েল হত্যার চক্রান্ত করেছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। তেহরানের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটন যখন আলোচনায় ব্যস্ত ছিল, তখনই এই চক্রান্তের খবর পাওয়া যায়। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা ইসরায়েলের কৌশলের অংশ ছিল।
মার্কিন উদ্বেগ ও সতর্কতা
গত এপ্রিলে সংবেদনশীল যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরু হলে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে হত্যার সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উদ্বেগ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, এই হত্যা চক্রান্ত আলোচনাকে ব্যর্থ করে দেবে—এ আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলের অন্যান্য দেশকে ইরানের এই দুই কর্মকর্তার নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক করতেও বলেছিল।
মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের তীব্রতম পর্যায়ে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে আরাগচি ও গালিবাফ ইসরায়েলের জন্য ‘বৈধ’ লক্ষ্যবস্তু হতে পারতেন। কারণ, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের কট্টরপন্থী সরকারকে উৎখাত করা। কিন্তু এপ্রিলে যখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়, তখন মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করতেন, ইরানি নেতাদের হত্যার যেকোনো চেষ্টা আলোচনা নস্যাৎ করে দেবে এবং যুদ্ধকে উসকে দেবে।
যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও ইসরায়েলের কৌশল
আংশিকভাবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের মাধ্যমে এই যুদ্ধ শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। মার্কিন হামলায় ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারকে নিশানা করা হলেও ইসরায়েল যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে তেহরানের নেতৃত্বকে হত্যার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যত বেশি সম্ভব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে হত্যা করা।
তাঁদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত এমন কিছু বাস্তববাদী নেতাকে হত্যাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যাঁদের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনায় বসার আশা করেছিল। যেমন ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি এবং ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি। ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার সময় এই দুই ব্যক্তিই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় সম্পৃক্ত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল লক্ষ্যের ভিন্নতা
ইরানের শীর্ষ দুই আলোচককে হত্যার সম্ভাব্য ইসরায়েলি চক্রান্ত সম্পর্কে ট্রাম্প প্রশাসনের সন্দেহ প্রমাণ করছে, যুদ্ধ শুরুর ঠিক প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো কাছাকাছি থাকলেও তা কত দ্রুত সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে চলে যায়। এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তি চাইলেও ইসরায়েল প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান ছিল।
এপ্রিলের প্রথম দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের অনিচ্ছাকৃত সমর্থন এবং ইসরায়েলের সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র খুব দ্রুত যুদ্ধ শেষ করছে। ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরিবর্তে ইরানের সরকার আরও বেশি কঠোর হয়ে ওঠে। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দেশের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করেছে।
আলোচনা ও চুক্তি
আরাগচি ও গালিবাফ হলেন সেই দুই গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ কর্মকর্তা, যাঁরা যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও স্থায়ী শান্তির জন্য অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি রূপরেখা চুক্তিতে পৌঁছেছে, যাতে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
ইসরায়েলের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা এই প্রাথমিক চুক্তিকে বিপর্যয় হিসেবে দেখেছেন। কারণ, এটি তাঁদের দেশের যুদ্ধের লক্ষ্য—যেমন শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করা, ইরানের প্রক্সি বাহিনীকে ধ্বংস করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মারাত্মক ক্ষতি করা—এমন কোনো লক্ষ্যই পূরণ করতে পারেনি। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আরও আশঙ্কা করেছিলেন, এই চুক্তির ফলে ইরান শত শত কোটি ডলার পাবে, যা তাদের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষাকে উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ না করেই যুদ্ধের পর দ্রুত পুনর্গঠনের সুযোগ করে দেবে।
ইসরায়েলের হত্যা চক্রান্তের বিবরণ
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গত মার্চে প্রতিবেদন করেছিল, ইসরায়েলের হত্যার চক্রান্তের তালিকায় আরাগচি ও গালিবাফ ছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরুর বিষয়ে কথা বলার পর সাময়িকভাবে তাঁদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের দুজন কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন সেই সময়ে জানতে পেরেছিল, অন্তত গালিবাফ ইসরায়েলের হত্যা চক্রান্তের তালিকায় ছিলেন। তারা ইসরায়েলকে এ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছিল।
ইরানের তিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মন্তব্য থেকে জানা যায়, গালিবাফ ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের সংঘাত এবং চলতি বছরের যুদ্ধ—দুবারই প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন। ইসরায়েল পাহাড়ের নিচে একটি বাংকারে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এক বৈঠককে নিশানা করে হামলা চালিয়েছিল। কর্মকর্তারা জানান, উভয় ঘটনায় গালিবাফকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়।
আলোচনার সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা
এপ্রিলের শেষের দিকে পাকিস্তানের ইসলামাবাদের বৈঠক শেষে ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য মহসেন জাঙ্গানেহ বলেন, ‘আজ গালিবাফ, আরাগচি এবং আলোচক দলের অন্য সদস্যরা গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকির কথা জেনেও তাঁদের জীবন বাজি রেখেছেন। একে রাজনৈতিক চালবাজি নয়, বরং প্রকৃত এক আত্মত্যাগ বলা যায়।’ আলোচনার সময় শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর ইসরায়েলের হামলা ঠেকাতে ইরান সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল।
কর্মকর্তারা বলেন, গত এপ্রিলে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে দেখা করতে গালিবাফের ইসলামাবাদ যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন ছিলেন, ইসরায়েল এ সুযোগ ব্যবহার করে আলোচনা নস্যাৎ করতে গালিবাফ বা আরাগচিকে হত্যা করতে পারে। কর্মকর্তারা বলেন, ইরানের কর্মকর্তারা পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিশ্চয়তা চেয়েছিল—ইসরায়েল ইরানি প্রতিনিধিদলকে লক্ষ্য করে কোনো গোপন হত্যাকাণ্ড চালাবে না।
পাকিস্তানের যুদ্ধবিমানগুলো ৭০ জনের বেশি ইরানি একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে আসা ইরানের উড়োজাহাজগুলোকে ইরানের সীমান্ত থেকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত এবং অধিবেশন শেষ হওয়ার পর আবার ফেরত যাওয়ার সময় পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু তেহরানে ফেরার পথে ইসরায়েলের দিক থেকে নিরাপত্তা–হুমকি দেখা যায়। দুই কর্মকর্তা বলেন, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী গালিবাফকে তেহরানে ফিরিয়ে নেওয়া বিমানটিকে জানায়, তারা গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে জানতে পেরেছে, ইসরায়েল গালিবাফকে বহনকারী উড়োজাহাজে হামলার চক্রান্ত করছে। দুটি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরাকের কাছাকাছি পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে।
ইসলামাবাদে গালিবাফের সফরসঙ্গী জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। উড়োজাহাজটি পাকিস্তান সীমান্তের সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর ইরানের মাশহাদ শহরে জরুরি অবতরণ করে। ইরানি প্রতিনিধিদলটি স্থলপথে প্রায় আট ঘণ্টা ভ্রমণ করে তেহরানে ফিরে আসে বলে মোহাম্মদি এবং ওই দুই কর্মকর্তা জানান।
তবু ইরানের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ভ্রমণ চালিয়ে গেছেন। মে মাসের শেষের দিকে গালিবাফ ও আরাগচি আলোচনার জন্য কাতারে যান। তারপর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দ্বিতীয়বার সরাসরি বৈঠক করতে গত জুনে সুইজারল্যান্ডে যান।



