রাষ্ট্র পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সমাজের নবায়ন: আবুল মোমেন
রাষ্ট্র পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, সমাজের নবায়ন জরুরি

কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেছেন, সমাজসংস্কারের আন্দোলন ফেলে রেখে রাষ্ট্রের টেকসই রূপান্তর সম্ভব নয়। তিনি আজ রোববার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক মে দিবস স্মারক বক্তৃতায় এ মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এ বক্তৃতার আয়োজন করে।

সমাজের অচলায়তন ভাঙার প্রয়োজনীয়তা

আবুল মোমেন বলেন, রাষ্ট্র বহুবার খোলস বদলেছে, কিন্তু সমাজ রয়ে গেছে তার সনাতন সংস্কৃতিতে। তিনি বলেন, ‘বধির অবিবেচক সমাজকে জোরগলায় জানাতে হবে যে সে তামাদি, তার চিন্তার জট খোলা দরকার, প্রয়োজন তার নবায়ন।’

শ্রেণি, ক্ষমতা ও নৈতিকতার সম্পর্ক

স্মারক বক্তৃতায় সমাজের শ্রেণি, ক্ষমতা ও নৈতিকতার সম্পর্ক কীভাবে কাজ করে, তা বিশ্লেষণ করেন আবুল মোমেন। তিনি ঐতিহাসিকভাবে সুযোগ, সম্পদ ও ক্ষমতা কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থেকে সামাজিক বৈষম্য ও অবিচার টিকিয়ে রাখার সমালোচনা করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শ্রমিক রাজনীতির চ্যালেঞ্জ

তিনি বলেন, রাজনীতিতে বহু গালভরা কথার ফুলঝুরি ছোটে, তবে নিম্নবর্গের মানুষের জন্য সমতা, মর্যাদা ও তাৎপর্যপূর্ণ জীবন সৎভাবে অর্জন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় শ্রমিক রাজনীতির আদর্শিক শক্তি ধরে রাখা ও বাড়ানো প্রায় দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জ।

ক্ষমতা ও নৈতিকতার সংকট

আবুল মোমেন বলেন, ক্ষমতা ও সুবিধাভোগী শ্রেণির উত্থানই শুধু দেখা যায়, পতন কালেভদ্রে। রাজনৈতিক পালাবদলে কারও পতন হলেও তার শূন্যস্থান পূরণে নতুন কারও উত্থান হতেও দেরি হয় না। তিনি বলেন, ‘যত নীতিকথা তত ফাঁপা’—বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক বা সামাজিক কথাবার্তায় চেতনা আর নীতিকথার কোলাহল যত বাড়ে, বুঝতে হবে সমাজের ভেতরটা ততই ফাঁপা।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নজরুলের বাণী

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ কবিতা উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘এই সময়ে, যখন মানুষের উত্তেজনা–ক্ষোভ-ক্রোধ প্রকৃত বীরত্বের প্রকাশ না ঘটিয়ে কাপুরুষের মবতন্ত্রের জন্ম দেয়, তখন বিদ্রোহী কবির জোরালো ভাষায় রচিত বাণীর মনুষ্যত্বের বার্তা আপনার–আমার সঠিক তন্বীতে ঘা দেবে বলেই আমার বিশ্বাস।’

শিক্ষায় বৈষম্য

বক্তৃতায় বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাস, ঔপনিবেশিক শোষণ ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য নিয়ে আলোচনা করেন আবুল মোমেন। তিনি বলেন, ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতায় জাগরণ-আন্দোলনের ঘটনা ঘটে, কিন্তু আজ ২০০ বছরে সবার জন্য শিক্ষার, বিশেষত শিক্ষার মানের, সমতা নিশ্চিত করা যায়নি; বরং শিক্ষা নানা ধারায় বিভক্ত। বিত্তের ভিত্তিতে ধনী-মধ্যবিত্ত-দরিদ্রের শিক্ষায়ও হেরফের হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার বৈষম্য এবং মননঘাটতির এই ধারা সরকার কীভাবে কখন দূর করবে, আমরা জানি না। তবে সবার জন্য মানসম্পন্ন অভিন্ন শিক্ষার দাবি তুলতে ভুললে চলবে না।’

সমাজের সাংস্কৃতিক প্রবণতা

সমাজের সাংস্কৃতিক প্রবণতা, চিন্তাধারার সীমাবদ্ধতা ও পরিবর্তনের প্রতি প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে আবুল মোমেন বলেন, বাঙালি স্বভাবত সামাজিক প্রবণতা হলো অভ্যস্ত পথে চলা, পরিচিত মহলের অভ্যন্তরে থাকা। নানা অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে তারা অনেকবার তেড়েফুঁড়ে জেগে উঠেছে, কিন্তু তা রাষ্ট্রীয় অঙ্গনে পরিবর্তন ঘটালেও সমাজবদলের কাজে সার্থক হয়নি। তাই এই প্রতিবন্ধক বা অচলায়তন নিয়ে আরও বেশি করে ভাবা জরুরি।

দায় গ্রহণের আহ্বান

আবুল মোমেন মনে করেন, এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবাইকে ‘কালাতিক্রান্তির’ (যে সময় অতিক্রান্ত হয়েছে) দায় গ্রহণ জরুরি। তিনি বলেন, একজন শ্রমজীবীকে কেবল কারখানা বা শস্যক্ষেত্রে আবদ্ধ থাকলে চলবে না। চৌদ্দপুরুষের অভ্যস্ত জীবনে বাস করলে চলবে না। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অতিমারির মতো ঘটনার তিনিও তো শিকার। এসব বৈশ্বিক সংকটের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির কল্যাণে সবার জন্যই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট খুলে যাচ্ছে।

ইতিবাচক সৃজনশীল শ্রমজীবী

ইতিবাচক সৃজনশীল শ্রমজীবী যেকোনো সমাজের সম্পদ বলে উল্লেখ করেন আবুল মোমেন। তিনি বলেন, উত্তরণের জন্য শ্রমিকের মনের সহজাত বিকাশ-শক্তির অর্গল খুলে দিতে হবে। তাকে আনন্দ পেতে দিতে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৃষ্টিতে তার সক্ষমতা বাড়াতে দিতে হবে। আর তা বাড়লেই তার সংগ্রামী শক্তি বিজয় অর্জন পর্যন্ত টেকসই হবে।