বাকস্বাধীনতা নাকি তথ্যসন্ত্রাসের দাপট?
বাকস্বাধীনতা নাকি তথ্যসন্ত্রাসের দাপট?

তথ্য আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তথ্য হয় সম্পদ, তথ্য হয় জ্ঞানের ভাণ্ডার। কিন্তু সেই তথ্যই আবার হয়ে ওঠে সন্ত্রাস, মানুষকে ঘায়েল করার অস্ত্র—যদি তা অপতথ্য হয়। আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে নানা অধিকার রয়েছে, যেমন মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার। তার মধ্যে মতপ্রকাশের অধিকার, যাকে আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলি, তা আমাদের মানসিক তৃষ্ণা মেটানোর এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পেলে মানুষ পেটের ক্ষুধাও ভুলতে পারে।

এই মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অনেক ক্ষেত্রে বাকস্বাধীনতা বলা হয়, কিন্তু তা শুধু বাকস্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি লেখার স্বাধীনতাও বটে। বর্তমানে এটি সামাজিক মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকের পরিসরে আবদ্ধ হয়ে গেছে। আমরা সুবিস্তীর্ণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই। ইতিহাসে এর জন্য মানুষ লড়াই করেছে, সংগ্রাম করেছে, জীবন দিয়েছে, এমনকি গণঅভ্যুত্থানও ঘটেছে। আমাদের দেশেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য মানুষ গ্রেফতার হয়েছে, রাতের আঁধারে ধরা পড়েছে, গুম ও খুন হয়েছে। মাত্র দুই বছর আগের ১৬ বছর আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত দেখেছি, যা কখনো কাম্য ছিল না।

একটি সরকারব্যবস্থা কীভাবে ফ্যাসিবাদী কাঠামোতে পরিণত হতে পারে, তার উদাহরণ ছিল পলাতক আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। সামান্য ইঙ্গিত করে ফেসবুকে লেখার কারণেও মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের তীব্র ক্ষোভ মানুষের মনে পুঞ্জীভূত হয়, যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গে রূপান্তরিত হয়ে বিস্ফোরিত হয়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে মানুষ মিলেমিশে শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে শামিল হয়, অনেকেই শুধু বাকস্বাধীনতা হরণের কারণেই নেমেছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জুলাই-আগস্টের এই অভ্যুত্থান বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ও আলোচিত হয়েছে। আমরা একটি মানদণ্ড দাঁড় করিয়েছিলাম যে, আমরা আগের ফ্যাসিবাদী কাঠামো থেকে বের হব, বাকস্বাধীনতা চর্চা করব, নির্বিঘ্নে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রয়োগ করব। স্বাধীনতা পাওয়ার পর আমরা কতটুকু প্রয়োগ করব বা তার সীমাবদ্ধতা কী, তা জানা প্রয়োজন ছিল। আমরা সেই সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারিনি, ফলে স্বাধীনতাকে তথ্য সন্ত্রাসে রূপান্তরিত করেছি। বর্তমানে সরকারের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্য মন্ত্রীদের নামে ভুয়া তথ্য, অপতথ্য, মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা, অপপ্রচার—সবই করা হচ্ছে।

এসবের বড় চর্চা ছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে, এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল পরিকল্পিতভাবে এসব কাজ করে। তারা ফেসবুকে ফেক আইডি, বট আইডির মাধ্যমে অপতথ্য ছড়ায়, মোবাইল ফার্মিং ও নানাবিধ প্রযুক্তি ব্যবহার করে, বিশেষ করে এআই দিয়ে তৈরি ফটোকার্ড। এসব ব্যবহার করে মানুষের চরিত্রহরণ, ব্যক্তিগত আক্রমণ—এমন কোনো কাজ নেই যা তারা করেনি।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চয়ই প্রয়োজন, কিন্তু তা কি কাউকে অশোভন, অশ্রাব্য, অশালীন ভাষায় অপমান-অপদস্থ করা? চরিত্র হরণের চেষ্টা করা? এর জন্য কি আমরা লড়াই করেছিলাম? বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, তিনি দায়িত্ব নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশালী ব্যবস্থার একটি কাজ সমাধান করেছিলেন। শেখ মুজিব সব পত্রিকা বন্ধ করে মাত্র চারটি রেখেছিলেন, জিয়াউর রহমান তা ৫০০-এর অধিক করেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত উদাহরণ আমরা দেখেছি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত, যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। তখন পত্রিকার পাতায় তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন থেকে অপতথ্য—সবই করা হতো।

আমরা ভেবেছিলাম জুলাই-আগস্টের মানদণ্ডে পৌঁছে নতুন বাংলাদেশে আর সেসব দেখা যাবে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, চরিত্রহরণ, প্রোপাগান্ডা, অশ্রাব্য ভাষায় অপমান-অপদস্থ করার সংস্কৃতি এখনো জিইয়ে রয়েছে। একটি দল, যারা আগে এসব করত, তারাই আবার সেই কৌশল অবলম্বন করছে, যা ফ্যাসিবাদী কাঠামোর অংশ। এখন দেখা যায়, অপতথ্য ছড়ানোর দায়ে কাউকে গ্রেফতার করলে তা 'ফেসবুকে পোস্ট করার জন্য গ্রেফতার' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু শুধু পোস্ট করার জন্য কি গ্রেফতার করা যায়? ফেসবুকে কেউ কারও নোংরা ছবি আপলোড করলে এবং তা আইনের আওতায় এলে, সেটাকে কি 'ছবি দেওয়ার জন্য গ্রেফতার' বলা সম্ভব?

আইন, আদালত, বিচারব্যবস্থা নিজস্ব গতিতে চলবে। ফেসবুকে ব্যক্তিগত আইডি থাকলেই তা শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছায় চলবে না; সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও নৈতিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। স্বাধীনতার নামে বিগত দুই বছরে মবসন্ত্রাস ও বাকস্বাধীনতার নামে তথ্যসন্ত্রাস থেকে পরিত্রাণ প্রয়োজন।