মে দিবসের চেতনা: আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রয়োজন সামাজিক কর্মসূচি
মে দিবসের চেতনা: আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রয়োজন সামাজিক কর্মসূচি

১৮৮৬ সালের ১ মে। আমেরিকার শিকাগো শহরের হে-মার্কেটের শ্রমিকদের রক্তঝরা আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শ্রমিকের অধিকার। সেই ঐতিহাসিক সংগ্রাম আর অর্জিত সাফল্যকে স্মরণ করেই প্রতিবছর পালিত হয় ‘মে দিবস’, যা আজ বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবেও স্বীকৃত। কিন্তু আজ এত বছর পর এসে আমাদের গভীর আত্মোপলব্ধির সময় এসেছে, মে দিবসের এই মূল তাৎপর্য কি কেবলই ক্যালেন্ডারের একটি লাল পাতার ছুটির দিন বা কিছু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে?

মে দিবসের চেতনা ও বাস্তবতা

মে দিবসের এই চেতনাকে যদি আমাদের যাপিত জীবনে ধারণ করতে হয়, তবে দেশ অনুযায়ী সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনকে একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক লক্ষ্যে পরিচালিত করতে হবে। আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক কর্মসূচি। শিল্প বিপ্লবের যুগে অর্থনীতির যে অভাবনীয় উত্থান ঘটেছে, তার যেমন বহু ইতিবাচক দিক রয়েছে, তেমনি রয়েছে অনেক নেতিবাচক দিকও। এর সুবিধা ও অসুবিধার দোলাচলের মধ্যে আমাদের জীবনকে সহজতর করে তুলতে হলে সামাজিক বিপ্লবের কোনও বিকল্প নেই।

আজ যদি সামাজিক শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত থাকে, তবেই শিশুশ্রম বন্ধ করা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং সমাজের গভীর অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা সম্ভব। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, শিল্প বিপ্লবের সূচনালগ্ন থেকেই কৃষিভিত্তিক ও হস্তশিল্প অর্থনীতি দ্রুত রূপান্তরিত হয়ে শিল্পভিত্তিক ও যন্ত্র-উৎপাদন-প্রধান অর্থনীতিতে পরিণত হতে শুরু করে। এই অর্থনৈতিক রূপান্তর কেবল মানুষের কাজ করার পদ্ধতি কিংবা পণ্য উৎপাদনের ধরনই পরিবর্তন করেনি, বরং এটি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সমগ্র পৃথিবীর সাথে তাদের সামগ্রিক সম্পর্ককেও চিরতরে বদলে দিয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিল্প বিপ্লবের ইতিবাচক দিক

শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে সামাজিক সংগঠনের এই ব্যাপক পরিবর্তনের ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে এবং এর ফলে সৃষ্ট বিভিন্ন প্রভাব পৃথিবীর রাজনৈতিক, পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আধুনিক শিল্প ব্যবস্থায় একদিকে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে এবং অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সহজলভ্য ও সস্তা হয়ে উঠেছে। উৎপাদিত পণ্যগুলোর জন্য তৈরি হয়েছে নতুন নতুন বৈদেশিক বাজার এবং বাণিজ্যের ভারসাম্য উৎপাদকের অনুকূলে চলে গেছে। এটি একদিকে যেমন পণ্য উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর সম্পদ বৃদ্ধি করেছে এবং সরকারি কোষাগারে কর রাজস্ব যোগ করেছে; অন্যদিকে এটি পণ্য উৎপাদনকারী এবং পণ্য ভোগকারী দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও সম্পদের বৈষম্য বৃদ্ধিতেও ক্রমাগত অবদান রেখে চলেছে।

এই প্রক্রিয়ায় শ্রম-সাশ্রয়ী আবিষ্কারের দ্রুত বিবর্তন ঘটেছে এবং হস্তচালিত সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা অনেক কমে গেছে। আধুনিক সুবিধায় প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দ্রুত উৎপাদনের ফলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পণ্য ও মানুষ পরিবহনের জন্য নতুন ধরনের সরঞ্জাম ও যানবাহনের বিকাশ ঘটেছে। সড়ক ও রেল পরিবহনের প্রসার এবং টেলিগ্রাফ থেকে শুরু করে টেলিফোন, ফাইবার অপটিক লাইন কিংবা ইন্টারনেট সুবিধার ফলে আজ উৎপাদন, কৃষি ফসল সংগ্রহ, শক্তি উৎপাদন এবং চিকিৎসা কৌশলের অগ্রগতির খবর আগ্রহী পক্ষগুলোর মধ্যে দ্রুত আদান-প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। স্পিনিং মিলের মতো শ্রম-সাশ্রয়ী যন্ত্র এবং অন্যান্য আবিষ্কার—বিশেষ করে যেগুলো বিদ্যুৎ (যেমন গৃহস্থালীর সরঞ্জাম ও হিমায়ন) এবং জীবাশ্ম জ্বালানি (যেমন মোটরগাড়ি ও অন্যান্য জ্বালানিচালিত যানবাহন) দ্বারা চালিত—সেগুলোও শিল্প বিপ্লবের অত্যন্ত সুপরিচিত ফসল।

শিল্পায়নের ফলে সাধারণ মানুষের সম্পদ ও জীবনযাত্রার মানও বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, পোশাক এবং অন্যান্য গৃহস্থালীর সামগ্রীর খরচ কমে গেছে। যা তাদের অন্যান্য কাজের জন্য অর্থ সঞ্চয় করতে এবং ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তুলতে সরাসরি সাহায্য করে। এছাড়া নতুন উৎপাদন যন্ত্র আবিষ্কার এবং নতুন নতুন কারখানা নির্মিত হওয়ায় বিপুল নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ আর ভূমি বা খামার-সম্পর্কিত উদ্বেগের সাথে ততটা ঘনিষ্ঠভাবে আবদ্ধ থাকেনি। তারা খামারের শ্রম থেকে প্রাপ্ত মজুরি বা খামার থেকে উৎপাদিত উদ্ভিদ ও প্রাণীজ পণ্যের উপর একক নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পেয়েছে। শিল্পায়ন ব্যক্তিগত সম্পদের প্রধান উৎস হিসেবে ভূমি মালিকানার ওপর গুরুত্ব অনেক কমিয়ে দিয়েছে।

শিল্প বিপ্লবের নেতিবাচক দিক

তবে এই রূপান্তরের অন্ধকার দিকটিও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। শিল্প বিপ্লবের ফলে একসময় ছোট শিশুরা প্রায়শই সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কারখানার বিপজ্জনক কাজে নিযুক্ত হতে বাধ্য হয়েছে। নতুন এই উৎপাদন ব্যবস্থায় কারখানার মালিকরা তাদের শ্রমিকদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করতে শুরু করেন। প্রতিটি দল একটি নির্দিষ্ট কাজের ওপর মনোযোগ দেয়। যেমন, কিছু দল পণ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত কাঁচামাল সংগ্রহ করে কারখানায় নিয়ে আসত, অন্য দলগুলো বিভিন্ন যন্ত্রপাতি চালাত। আবার শ্রমিকদের কিছু দল যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেলে তা মেরামত করত এবং অন্যদের ওপর সেগুলোর উন্নতি সাধন ও কারখানার সামগ্রিক পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হতো।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে ছিল চরম মানবিক বিপর্যয়। শিল্পায়নে উন্নত মজুরির প্রতিশ্রুতি অনেক অভিবাসীকে এমন সব শহর ও শিল্পনগরীতে আকৃষ্ট করে তোলে, যেগুলো এই বিপুল জনসংখ্যার চাপ সামাল দেওয়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। যদিও অনেক এলাকায় প্রাথমিক আবাসন সংকট অবশেষে নির্মাণকাজের জোয়ার এবং আধুনিক ভবন নির্মাণের ফলে দূর হয়েছিল, কিন্তু শুরুর দিকেই ঝুপড়ি ও অন্যান্য নিম্নমানের আবাসন দিয়ে তৈরি হয় ঘিঞ্জি বস্তি। মানুষের এই আকস্মিক আগমনে স্থানীয় পয়ঃনিষ্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং পানীয় জল প্রায়শই দূষিত হতে থাকে। এত কাছাকাছি বসবাস, নিম্নমানের কর্মপরিবেশে ক্লান্তি এবং অনিরাপদ জল পান করার ফলে মানুষের মাঝে টাইফয়েড, কলেরা, বসন্ত, যক্ষ্মা এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। শহরাঞ্চলে এইসব রোগের চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাই পরবর্তীতে অনেক শিল্পোন্নত শহরে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং আধুনিক নির্মাণ বিধি, স্বাস্থ্য আইন ও নগর পরিকল্পনার বিকাশে বড় প্রেরণা জুগিয়েছিল।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও করণীয়

আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষ পৃথিবীর স্থলভিত্তিক মোট প্রাথমিক উৎপাদনের ৪০ শতাংশেরও বেশি ব্যবহার করছে। যেহেতু বিশ্বের জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং আরও বেশি মানুষ শিল্প বিপ্লবের দ্বারা প্রতিশ্রুত বস্তুগত সুবিধার জন্য সচেষ্ট হচ্ছে, তাই পৃথিবীর আরও বেশি সম্পদ মানুষের ব্যবহারের জন্য আত্মসাৎ করা হচ্ছে। এর ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণীদের জন্য সম্পদের ভাণ্ডার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যাদের বাস্তুতান্ত্রিক সেবার (যেমন, বিশুদ্ধ বায়ু, বিশুদ্ধ পানি ইত্যাদি) ওপর পুরো জীবমণ্ডল নির্ভরশীল।

অতএব, মে দিবসের মূল তাৎপর্য আজ তখনই সফল হবে, যখন এই বিশাল পরিবর্তন ও সংকটগুলোকে আমরা সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারব। আর এই কাজটি সহজভাবে সম্পন্ন করতে হলে নাগরিক সমাজের পাশাপাশি রাজনৈতিক শক্তির সামাজিক দায়বদ্ধতার কোনো বিকল্প নেই। একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমেই কেবল শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত মুক্তি এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক পরিচিতি: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী।