কুমিল্লার হোমনায় এসএসসি পরীক্ষার হলে সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়ার ফেসবুক লাইভ, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষা
হোমনায় এসএসসি পরীক্ষার হলে সংসদ সদস্যের ফেসবুক লাইভ

কুমিল্লার হোমনায় এসএসসি পরীক্ষার হলে সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়ার ফেসবুক লাইভ

কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার প্রথম দিনে শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা উপেক্ষা করে কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া। শুধু তাই নয়, পরীক্ষাকেন্দ্র ও হল পরিদর্শনের পুরো ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভ বা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে।

ঘটনার বিবরণ

আজ মঙ্গলবার সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে হোমনা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। পরীক্ষাকেন্দ্রের মতো স্পর্শকাতর স্থানে সংসদ সদস্যের ফেসবুক লাইভ নিয়ে সমালোচনা করেছেন অভিভাবকেরা। অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনের সংসদ সদস্য এবং বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। পাশাপাশি তিনি শিক্ষকদের একটি সংগঠনের শীর্ষ নেতা। লাইভটি মঙ্গলবার বিকেল চারটা পর্যন্ত ‘অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া এমপি’ নামে থাকা সংসদ সদস্যের ফেসবুক পেজে দেখা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজ সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরপরই সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া ওই কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। এ সময় ‘অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া এমপি’ ফেসবুক পেজ থেকে লাইভ শুরু হয়। লাইভের ক্যাপশনে লেখা হয়, কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্যের পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন: ২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য তাঁর নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লাইভের ভিডিওতে যা দেখা গেছে

৮ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের লাইভে দেখা যায়, সেলিম ভূঁইয়া হোমনা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠছেন। পরে পরীক্ষার হলের একটি কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষক ও পরীক্ষার্থীদের অঙ্গভঙ্গিতে নির্দেশনা দিচ্ছেন। সেখান থেকে বেরিয়ে সামনের কক্ষের দিকে যাচ্ছেন। এ সময় ক্যামেরার পেছনে থাকা কেউ একজন সংসদ সদস্যের পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনের বর্ণনা করছেন। পরে একটি কক্ষে ঢুকে সংসদ সদস্য এক শিক্ষার্থীর কাছে যান। এ সময় তিনি ওই শিক্ষার্থীর কাছে প্রশ্ন সহজ হয়েছে কি না, কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না—এসব জানতে চান। কিছুক্ষণ পর সেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে অন্য একটি কক্ষের দিকে যেতে থাকলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক এসে তাঁকে সালাম দিয়ে বলেন, ‘আমি প্রধান শিক্ষক।’ এ সময় সংসদ সদস্য তাঁকে ‘আপনি আপনার কাজ করেন’ বলে হাতের ইশারা দিয়ে চলে যেতে বলেন। ভিডিওতে একসময় সংসদ সদস্যের সঙ্গে হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) টমাস বড়ুয়াকেও দেখা গেছে।

শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা

১২ এপ্রিল রাজধানীর আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে কেন্দ্রসচিবদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঘোষণা দিয়েছিলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে কোনো জনপ্রতিনিধি প্রবেশ করতে পারবেন না। এই নির্দেশনা স্পষ্টভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিভাবকরা মনে করছেন।

অভিভাবকদের সমালোচনা

সেলিম ভূঁইয়ার কেন্দ্র পরিদর্শনের ফেসবুক লাইভের সমালোচনা করছেন অভিভাবকেরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, ‘পরীক্ষার হলে মোবাইল নিয়ে লাইভ করায় শিক্ষার্থীদের মনোযোগে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটেছে। সংসদ সদস্যের সাথে আরও কয়েকজন ব্যক্তি ছিল, যারা ভিডিও করতে তাঁকে সহায়তা করছিল। এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

কেন্দ্র সচিব ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া

হোমনা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের সচিব ও প্রধান শিক্ষক তাজুল ইসলাম বলেন, সংসদ সদস্য আসার খবর শুনে তিনি দেখা করতে গিয়েছিলেন। তবে ফেসবুকে লাইভ করার বিষয়টি তিনি খেয়াল করেননি। কারা লাইভ করেছেন, তিনি জানেন না। জানতে চাইলে হোমনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রের ভেতরে মোবাইল নিয়ে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। ইতিমধ্যে তিনি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়েছেন।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. শামছুল আলম বলেন, শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো জনপ্রতিনিধি কেন্দ্রে যেতে পারেন না, সেখানে লাইভ করা তো দূরের কথা।

সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা

এ বিষয়ে কথা বলতে সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ধরেননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি বলেন, ‘এমপি সাহেবের নামের ওই ফেসবুক পেজ তিনি নিজে পরিচালনা করেন না। তাঁর সঙ্গে থাকা লোকজন ওই সময় লাইভ করেছিল। ফেসবুকে লাইভ হচ্ছে—এমপি সাহেব নিজেও বিষয়টি বুঝতে পারেননি।’

এই ঘটনা পরীক্ষার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।