প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারা জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করে দিয়েছেন। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক পরিবর্তনগুলো—’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ’২৪-এর জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান—এসব আন্দোলনে ছাত্ররা গুলি খেয়েছে। তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই জানেন জুলাই আন্দোলনে চরশিবা এলাকার এক কলেজছাত্র, দশমিনার এক ছাত্র পরিবর্তন আনার জন্য জীবন দিয়েছেন। এই পরিবর্তনের সুফল ভোগ করছি আমরা সবাই।’
জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি
রোববার বিকালে পটুয়াখালীর গলাচিপায় উপজেলা প্রশাসন ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের আয়োজনে অফিসার্স ক্লাবে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
কোটা ব্যবস্থার সমালোচনা
প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, ‘আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, সরকারি চাকরিতে কোটা একটি অন্যায্য ব্যবস্থা ছিল। এটার পরিবর্তন হওয়া দরকার। এ কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী অধিকার থেকে বঞ্চিত। তারা চাকরি পাচ্ছে না। তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। তারা দেশের বাইরে চলে গেছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, বিসিএস দিয়ে অনেকে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পায় না, নানা অব্যবস্থাপনা ও মেধার অবমূল্যায়নের কারণে। ‘এ ব্যবস্থার পরিসমাপ্তি দরকার। তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, যেটাকে ব্রেইন ড্রেন বলে। আমাদের শিক্ষার্থীরা গুগল, ইউটিউব কিংবা গাড়ির বিখ্যাত ব্র্যান্ড—এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে।’
জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে স্বস্তি
তিনি বলেন, ‘বিগত দিনের তুলনায় জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে ভিন্ন মত-পথ মানুষ মন খুলে কথা বলছে, রাজনীতি করছে, সামাজিক কর্মকাণ্ড করছে। যারা ১৭ বছর নির্যাতিত নিষ্পেষিত ছিল, কিছুটা হলেও স্বস্তিসহকারে জীবন যাপন করছে। এই পরিবর্তনের জন্য এই মানুষগুলো জীবন দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা ত্যাগ স্বীকার করেছে তারা নিঃস্বার্থভাবে করেছে। “নিজের খাবার বিলিয়ে দিব অনাহারীর মুখে”, “সকলের তরে সকলে মোরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে”, “নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই”—এ কবিতাগুলো থেকে তারা অনুপ্রাণিত হয়েছে।’
শিক্ষার মূল্যবোধ ও শিক্ষকদের ভূমিকা
নুরুল হক বলেন, ‘শিক্ষার কাজ হচ্ছে মূল্যবোধ সৃষ্টি করা। নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে না পারি তাহলে সমাজ এবং রাষ্ট্রের পরিবর্তন সম্ভব নয়। সেজন্যই এখন এই সময় জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বাবা-মায়ের খোঁজখবর নিতে সন্তানের বা শিক্ষার্থীর মধ্যে মূল্যবোধ তৈরি করতে না পারেন, একজন শিক্ষক কোনো অংশেই বাবা-মায়ের চেয়ে কম নয়। একজন শিক্ষার্থীকে জীবন এবং বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা দিতে শিক্ষকদের কোনো বিকল্প নেই। বিভিন্ন সফলতার গল্প শুনিয়েছেন শিক্ষকরা। নিজে সফল হওয়া নয়, আশপাশের মানুষকে নিয়ে সফল হওয়া। নিজের সক্ষমতাকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র এবং সমাজকে নিয়ে কিছু করা।’
আত্মকেন্দ্রিকতা ও অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান
তিনি বলেন, ‘কেউ যদি শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিছু চিন্তা করে, আত্মকেন্দ্রিক চিন্তায় ভালো কিছু করতে পারে না। জীবনে কখনো আত্মতৃপ্তিও পায় না। বরং সেই সবচেয়ে বেশি হতাশায় নিমজ্জিত হয়। যে সবাইকে নিয়ে চিন্তা করে, সমাজকে নিয়ে চিন্তা করে, পরিবারকে নিয়ে চিন্তা করে সে ভালো থাকতে পারে। ভালো থাকার জন্য বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না। যেটুকু আছে সেটুকু নিয়েই আপনি তৃপ্ত থাকেন। সবাই ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে—এটা না। কেউ যদি খেলাধুলায় ভালো পারে, কেউ যদি সাংস্কৃতিক পারফরমেন্স ভালো পারে তাহলে তাকে ওখানে উৎসাহিত করেন। বিভিন্ন প্রফেশনে বিভিন্নজন যাবে। এটাই দুনিয়ার একটা বাস্তবতা।’
অভিভাবকদের প্রতি নুরুল হক আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনাদের সন্তানদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি না করে তাদেরকে আনন্দের সঙ্গে এবং স্বস্তির সঙ্গে পড়াশোনায় উৎসাহিত করেন। এখন ইউনিয়ন লেভেল থেকে কিছুটা হলেও আধুনিক সুবিধা ভোগ করছেন।’
সামাজিক পরিবর্তনের আহ্বান
নুরুল হক বলেন, ‘কয়েক মাসের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি জায়গা-জমির বিরোধ নিয়ে এত মানুষ আসে, এত আবেদন। আমরা যদি সামাজিক পরিবর্তন করতে চাই তাহলে নিজেদের পরিবর্তন করতে হবে। নিজেদের মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে অন্যান্য অতিথি
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুজর মো. ইজাজুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ড. আব্দুল লতিফ মাসুম, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. শহিদুল ইসলাম, গলাচিপা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফোরকান কবির, গলাচিপা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইমতিয়াজ আহমেদ, উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক মো. হাফিজুর রহমান, জেলা যুব অধিকার পরিষদের সহ-সভাপতি মো. মহিবুল্লাহ এনিম প্রমুখ।



