ভারতে বিরোধীদের নতুন লক্ষ্য নির্বাচন কমিশনার, অভিশংসন প্রস্তাবের প্রস্তুতি চলছে
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তপ্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার পর এবার বিরোধীরা তাদের নিশানা করেছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের দিকে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে অভিশংসনের খসড়া প্রস্তাব ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে এবং বিভিন্ন বিরোধী দলের সদস্যদের সম্মতি আদায়ের কাজ চলছে।
অভিশংসন প্রস্তাবের প্রক্রিয়া ও চ্যালেঞ্জ
লোকসভার স্পিকার বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবের আলোচনা শেষ হলেই জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব তোলা হবে বলে ঠিক হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস চাইছে লোকসভা ও রাজ্যসভা—দুই কক্ষেই এই প্রস্তাব পেশ করতে। তবে সংসদে এই প্রস্তাব পেশ করতে গেলে লোকসভার ১০০ জন ও রাজ্যসভার ৫০ জন সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন, যা বিরোধীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অভিশংসন বা ইমপিচ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের পদ থেকে সরানো যায় না। নরেন্দ্র মোদি সরকারের তৈরি করা আইন অনুযায়ী নির্বাচন–সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্তের দরুণ কমিশনের কারও বিরুদ্ধে মামলাও করা যায় না, যা এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংসদীয় অধিবেশনে উত্তেজনা ও বিক্ষোভ
বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্ব গত সোমবার থেকে শুরু হয়েছে। সরকার প্রথম দিনেই স্পিকারের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শুরু করার পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু কংগ্রেসসহ অন্য বিরোধীরা পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার দাবি তোলায় তা সম্ভব হয়নি। সরকার সেই দাবি মানেনি, ফলে রাজ্যসভা থেকে বিরোধীরা ওয়াক আউট করেন এবং লোকসভায় প্রবল হট্টগোল দেখা দেয়।
এর মধ্যেই যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে দুই কক্ষে লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। মঙ্গলবার দুপুর ১২টার পর অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, কিন্তু তার আগে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিরোধীদের বিক্ষোভের কারণে আধ ঘণ্টার জন্য লোকসভার অধিবেশন মুলতবি হয়ে যায়। বিরোধীরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখান এবং তাঁরা জ্ঞানেশবিরোধী পোস্টার নিয়ে সভার ‘ওয়েলে’ নেমে ‘ভোট চোর গদ্দি ছোড়’ বলে স্লোগান দেন।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ
নির্বাচন কমিশনের ‘পক্ষপাত’ নিয়ে সবার আগে সরব হয়েছিল কংগ্রেস। মহারাষ্ট্র, হরিয়াণা, মধ্য প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে ভোটার তালিকায় কারচুপি ও ইভিএমে কারসাজির অভিযোগ এনে জ্ঞানেশ কুমারকে কাঠগড়ার তুলেছিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। বিরোধীদের অভিযোগ, বিজেপির জয় সহজ করতে জ্ঞানেশের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন কাজ করছে। বিহার নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের বিরুদ্ধেও সরব হয়েছিল বিরোধীরা, কিন্তু তাতে কমিশনকে ঠেকানো যায়নি।
ভোটার তালিকা সংশোধনে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ বিজেপিকে জেতানোর তাগিদ বলে একসময় কংগ্রেস যে অভিযোগ করেছিল, সেই এক অভিযোগে এবার কোমর কষে নেমেছেন পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনের ‘একচোখোমি’ ও পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে কলকাতার ধর্মতলায় ধরণায় বসেছেন। সেই আন্দোলনেরই অঙ্গ হতে চলেছে অভিশংসন প্রস্তাব, একই সঙ্গে রাজ্য সরকার বারবার দ্বারস্থ হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টেও।
বিরোধীদের কৌশল ও ঐক্য
স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের পরিণতি যেমন জানা, তেমনই জানা, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আলোচিত হলেও তা পাস করা সম্ভবপর নয়। দুটি ক্ষেত্রের কোনোটিতে সফল হওয়ার মতো সংখ্যার জোর সংসদে বিরোধীদের নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিরোধীরা তৎপর, কারণ সংসদে প্রকাশ্যে সমালোচনা করার অধিকার পাওয়া যাবে এবং নির্বাচন কমিশনের চরিত্র সবার সামনে তুলে ধরা যাবে বলে।
গত সোমবার সংসদীয় অধিবেশন শুরুর আগে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের সঙ্গে বিরোধী নেতাদের বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনার বিষয়টি উল্লেখ করেন তৃণমূলের লোকসভার উপনেতা শতাব্দী রায়। তিনি বলেন, চার রাজ্যের ভোটের ঠিক আগে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের নামে নির্বাচন কমিশন যা খুশি তাই করে চলেছে, লাখ লাখ ভোটারের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিচ্ছে এবং এসব করছে বিজেপির সুবিধার জন্য।
শতাব্দী আরও বলেন, মানুষের ভোটদানের অধিকার নিশ্চিত করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাস্তায় নেমে যখন লড়ছেন, তখন তাঁর পাশে অন্য বিরোধীদেরও দাঁড়ানো উচিত। তৃণমূলের এই উদ্যোগকে কংগ্রেস সমর্থন জানিয়েছে, যেমন তৃণমূলও ঠিক করেছে স্পিকারের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব সমর্থন করার। স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন অনেক দিন পর পুরো বিরোধীদের জোটবদ্ধ করেছে, যা ভারতের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
