হামে শিশু মৃত্যু: পিআইসিইউ সংকটে চিকিৎসা পাচ্ছে না আক্রান্তরা
হামে শিশু মৃত্যু: পিআইসিইউ সংকটে চিকিৎসা পাচ্ছে না আক্রান্তরা

দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যু বাড়ছে। পিআইসিইউ শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশু চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জেলা পর্যায়ে পিআইসিইউ স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।

পিআইসিইউ সংকটে শিশু মৃত্যু

নাটোরের সোহাগ কুমার ও বন্দনা রানীর প্রথম সন্তান গৌরী মাত্র ছয় মাস বয়সে হামে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তির অপেক্ষায় মারা যায়। ১৮ এপ্রিল হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে তার মৃত্যু হয়। সোহাগ কুমার বলেন, 'আইসিইউতে ভর্তির জন্য যখন সিরিয়াল পাওয়া গেল, ততক্ষণে আমার গৌরী আর নাই।'

গৌরীর মতো অনেক শিশুর বাবা-মায়েরা চিকিৎসকের পরামর্শে পিআইসিইউ শয্যার খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু শয্যা খালি পাচ্ছেন না। বড়দের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রকে আইসিইউ এবং শিশুদের জন্য পিআইসিইউ বলা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বড় ও ছোটদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের মধ্যে কিছু দিক দিয়ে ভিন্নতা রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ও সংকট

কোভিড মহামারির সময় দেশে আইসিইউর সংকট বড় হয়ে উঠেছিল। হাইকোর্টের এক আদেশে সরকার জানায়, সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা ৭৩৩টি। ২০২২ সালের নভেম্বরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে মোট ১ হাজার ১৬৯টি আইসিইউ থাকার কথা বলা হয়। বর্তমানে ৭৪টি মেডিকেল কলেজ, জেলা, বিশেষায়িত ও জেনারেল হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। তবে শিশুদের জন্য পিআইসিইউর আলাদা কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি।

জেলা হাসপাতাল ও বিভাগীয় হাসপাতালে অনেক ক্ষেত্রে পিআইসিইউ নেই। সেখান থেকে হামে আক্রান্ত মুমূর্ষু অনেক শিশুকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকার হাসপাতালেও পিআইসিইউ শয্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিভাগীয় হাসপাতালে পিআইসিইউর অভাব

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পিআইসিইউ নেই। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, 'এ ধরনের কোনো সাপোর্ট প্রয়োজন হলে আমরা রোগীকে ঢাকায় স্থানান্তর করি।' রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আ ন ম তানভীর চৌধুরী বলেন, 'আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়, কিন্তু সেটা দেওয়ার সুযোগ নেই। বেশির ভাগ রোগীকে ঢাকায় রেফার করতে হয়।'

হামের প্রাদুর্ভাবের পরিসংখ্যান

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ৩৪ হাজার ৬৬২ জন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৩ হাজার ৩৪৮ জন। ৪ হাজার ৮৫৬ জনের হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। হামে সংক্রমিত শিশুদের মধ্যে মারা গেছে ৪৭ জন, আর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২২৬ জনের। মোট মৃত্যু ২৭৩ জন।

এক পরিবারের করুণ কাহিনী

সিরাজগঞ্জের মাহফুজুর রহমান ও নীলা আক্তারের মেয়ে মালিহা ১১ মাস বয়সে হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। পাবনার উল্লাপাড়া থেকে ঢাকার আশুলিয়া, তারপর রাজধানীর একের পর এক হাসপাতালে পিআইসিইউর খোঁজে ২০ দিন ধরে ছুটে বেড়ান মাহফুজুর। শেষ পর্যন্ত ১২ এপ্রিল মালিহা মারা যায়। চিকিৎসায় আড়াই লাখ টাকার বেশি খরচ হয়, যার জন্য স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি ও ধারদেনা করতে হয়।

মাদারীপুরের ১০ মাস বয়সী সোহা মণি হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের আরসিইউতে মারা যায়। এর আগে চারটি হাসপাতাল ঘুরতে হয় তাকে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের আইসিইউতে ছয় বছরের কম বয়সীদের জন্য ভেন্টিলেটর না থাকায় তাকে অন্য হাসপাতালে নিতে বলা হয়।

অর্থাভাবে আইসিইউ থেকে ফিরিয়ে আনা

কুষ্টিয়ার ৮ মাস বয়সী মো. নোমান ফালাক ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়। তাকে রাজশাহীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের পিআইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দুই দিনে ৫০ হাজার টাকা খরচ হওয়ায় বাবা তাকে কুষ্টিয়ায় ফিরিয়ে আনেন। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পিআইসিইউ না থাকায় প্লাস্টিকের বক্স ছিদ্র করে অক্সিজেন সরবরাহের 'হেডবক্স' তৈরি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

হামের স্থায়িত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ধারণা, হামের প্রাদুর্ভাব আরও এক থেকে দেড় মাস স্থায়ী হতে পারে। শিশুরা বেশি আক্রান্ত হওয়ায় পিআইসিইউ বেশি প্রয়োজন দেখছেন চিকিৎসকরা। ঢাকার শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. মজিবুর রহমান বলেন, দেশের হাসপাতালে পিআইসিইউর সংকট, দক্ষ জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি আছে। জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেন সেবা, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রথম আলোর ২৮ মার্চের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের শিশুদের জন্য আইসিইউ শয্যা মাত্র ১২টি, অথচ অপেক্ষমাণ থাকে ৩০ থেকে ৫০ শিশু। মার্চ মাসে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ শিশু মারা গেছে; আইসিইউতে নেওয়ার পরও বাঁচানো যায়নি ৯ জনকে।

বেসরকারি হাসপাতালের খরচ ও সমাধান

বেসরকারি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে খরচ বেশি হওয়ায় স্বল্প আয়ের পরিবারের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব হয় না। চিকিৎসক মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, সরকারের উদ্যোগে ৬৪ জেলায় পিআইসিইউ থাকা জরুরি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, জেলা হাসপাতালে পিআইসিইউ সেবা থাকা দরকার। এসব না থাকা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংকট। অনেক হাসপাতালে আইসিইউ থাকলেও তা চালাতে দক্ষ চিকিৎসক ও নার্স নেই।

আবু জামিল ফয়সাল আরও বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুকে শুরুতেই চিকিৎসা দিতে হবে। প্রয়োজন হলে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে হবে। পিআইসিইউ না থাকলে বিকল্প উপায়গুলোর ব্যবহার করা দরকার।