চাঁদপুরে ৫৪ বছরের প্রথা ভেঙে নারী ভোটারদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি)। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশব্যাপী সব ধরনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে ৩০০টি আসনের প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন কার্যকরী উদ্যোগ। এর মধ্যে ব্যতিক্রমী ও অভিনব উদ্যোগ দেখা গেছে চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে।
দীর্ঘ ৫৪ বছরের প্রথা ও নারী ভোটারদের অনুপস্থিতি
ওই আসনের রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে গত প্রায় ৫৪ বছর ধরে এক পীরের কথা মেনে অধিকাংশ নারী ভোটার ভোটকেন্দ্রে যান না। মাঝে মধ্যে অল্পসংখ্যক নারী ভোট দিলেও তা ছিল খুবই সীমিত ও নামমাত্র। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সত্তরের দশকে জৈনপুরের পীরের অনুরোধ মেনে ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের নারীরা ভোটের সময়েই ভোট দিতে যান না। যদিও ভোট ছাড়া আর বাকি সব কাজেই ওই ইউনিয়নের নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। তারা হাট-বাজারসহ যাবতীয় দৈনন্দিন কাজে স্বাধীনভাবে বিচরণ করেন।
জেলা প্রশাসনের যুগান্তকারী উদ্যোগ
তবে এবার জেলা প্রশাসনের সক্রিয় উদ্যোগে দীর্ঘদিনের সেই চর্চায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রগুলোতে শুধুমাত্র নারী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পর্দা বজায় রেখে ভোট দেওয়ার বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে নারীরা সম্পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্যে ও গোপনীয়তার সাথে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইউএনও সেটু কুমার বড়ুয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিশেষ ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতির বিস্তারিত
এবার এই ইউনিয়নের নারীরা যেন ভোট দিতে কেন্দ্রে যান, সে জন্য মোট ৮টি কেন্দ্রেই পর্দা মেনে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব কেন্দ্রে মোট ১০ হাজার ২৯৯ জন নারী ভোট দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। ফরিদগঞ্জ সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়নের ৮টি কেন্দ্রে নারী ভোটের জন্য ২০টি বিশেষ বুথ তৈরি করা হয়েছে। ওই বুথগুলোর জন্য সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে নারীদের নিয়োগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্য পুলিশ, আনসার-ভিডিপি এবং ৮টি কেন্দ্রের জন্য একজন নারী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৮ জন প্রার্থীকে ওই বুথগুলোতে নারী পোলিং এজেন্ট নিয়োগ দেওয়ার জন্য চিঠি ও মৌখিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
প্রশাসনের প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইউএনও সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, "আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ব্যাপক ও যুগোপযোগী উদ্যোগ নিয়েছেন। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে নারীদের ভোটের জন্য নারী ম্যাজিস্ট্রেটসহ সব নারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "নারীরা পর্দা মেনে ভোট দেওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আমরা আশাবাদী যে, এবার নারীরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে ভোটকেন্দ্রে আসবেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবেন।"
এই উদ্যোগটি শুধুমাত্র একটি নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নয়, বরং সামাজিক রীতিনীতির মধ্যে থেকে নারীর অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
