অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সামগ্রিক সংস্কার জরুরি: এডিবি
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সামগ্রিক সংস্কার জরুরি: এডিবি

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সামগ্রিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। তাদের নতুন মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজস্বকাঠামো, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে সংস্কার অপরিহার্য।

সংস্কারের আটটি ক্ষেত্র

এডিবি সংস্কারের জন্য আটটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এনবিআর পুনর্গঠন ও করব্যবস্থার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন, কেন্দ্রীয় ঋণ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গঠন, পরিকল্পনা ও বাজেটের মধ্যে সমন্বয়, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা জোরদার, উন্নয়ন প্রকল্প মূল্যায়ন ও ক্রয়ব্যবস্থা সংস্কার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি বাড়ানো, নিরীক্ষা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা।

রাজনৈতিক পটভূমি

‘বাংলাদেশ অ্যাট আ ক্রসরোডস অব রিফর্মস’ শীর্ষক ৫০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার পর শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। পরে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। সাংবিধানিক সংস্কার–সংক্রান্ত গণভোটে নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা বৃদ্ধির পক্ষে রায় দেয় জনগণ। এডিবির মতে, এই পুনর্গঠন এমন সময়ে ঘটছে যখন বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের মুখে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও চ্যালেঞ্জ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ কৃষি, পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও অর্থনীতির কাঠামো সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১১-২০ সময়ে গড় প্রবৃদ্ধি ৬.৮ শতাংশ থাকলেও ২০২১-২৫ সময়ে তা ৫.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন, জ্বালানিঘাটতি, বৈদেশিক চাহিদা কমে যাওয়া ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সব খাতেই চাপ বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কর-জিডিপি অনুপাত ও রাজস্ব চ্যালেঞ্জ

এডিবি বলছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো রাজস্ব ব্যবস্থা। কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭.৫ শতাংশ, যা এই অঞ্চল ও সমমানের অর্থনীতির তুলনায় অনেক কম। জটিল করহার, অসংখ্য কর-ছাড়, দুর্বল প্রশাসন, কাগজনির্ভর প্রক্রিয়া ও অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার কারণে রাজস্ব আদায়ে অদক্ষতা তৈরি হয়েছে। এনবিআরের ভেতরে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন একই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকায় স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋণ ও ব্যাংক খাতের ঝুঁকি

সরকারি ও সরকারি নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত ঋণ ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে। এর বড় অংশ অভ্যন্তরীণ ঋণ, যা ব্যাংকনির্ভর ঋণব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটাতে পারে। বাংলাদেশের ঋণ–ব্যবস্থাপনা এখনো সমন্বিত নয়; অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য সমন্বয়ের ঘাটতি আছে এবং কেন্দ্রীয় কোনো সমন্বিত ঋণভান্ডার নেই।

উন্নয়ন প্রকল্পে বিশৃঙ্খলা

সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বড় দুর্বলতা রয়েছে। বাজেট ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে প্রায়ই বড় ফারাক দেখা যায়। অর্থবছরের শেষ দিকে হঠাৎ উন্নয়ন ব্যয় বেড়ে যায়, যা দুর্বল পরিকল্পনা ও আর্থিক শৃঙ্খলার ইঙ্গিত। অনেক উন্নয়ন প্রকল্প যথাযথ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ছাড়াই অনুমোদন পায়। পরিবহন খাতের ৩২৯টি প্রকল্পের অর্ধেকেই সময় ও ব্যয় বেড়েছে; গড়ে ব্যয় বেড়েছে ২৬ শতাংশ এবং সময় বেড়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদে মুনাফার হার ৭৮ শতাংশ এবং ইকুইটিতে মুনাফার হার ৮৮ শতাংশ কমেছে। দায় ও সরকারি নিশ্চয়তা বেড়েছে। মালিকানা নীতি, নজরদারি ও জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হওয়ায় সরকারের সামগ্রিক আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে।

দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহি

দুর্নীতিবিরোধী আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা আছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিএজি) নিয়মিত নিরীক্ষা করলেও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, ডিজিটাল তথ্যপ্রবাহে সীমিত প্রবেশাধিকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাধার কারণে কার্যকর নজরদারি সম্ভব হচ্ছে না।

নতুন সরকারের লক্ষ্য ও বাস্তবতা

নতুন সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে চায়। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ করে ব্যয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে বড় ধরনের রাজস্ব সংস্কার প্রয়োজন হবে; নইলে দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।