মোহাম্মদপুর কি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি
মোহাম্মদপুর কি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে?

চাপাতি হাতে কয়েকজন তরুণ হঠাৎ নেমে আসে একটি পিকআপভ্যান, ব্যাটারিচালিত রিকশা কিংবা মোটরসাইকেল থেকে। টার্গেট বাসার সামনে নামা যাত্রী, গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারী, কিংবা দোকানের ক্যাশ কাউন্টার। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয় তাদের ‘অপারেশন’; এরপর মিলিয়ে যায় জনপদের ভিড়ে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সাম্প্রতিক ছিনতাই, হামলা ও দস্যুতার ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সেগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে— এলাকাটিতে অপরাধ আরও সংগঠিত, আরও দুঃসাহসী এবং আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

নামি এলাকার নতুন পরিচয়

নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যস্ত বাজার, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদপুর এখন ক্রমেই আরেক পরিচয়ে সামনে আসছে—ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, মাদক, চাঁদাবাজি, দখল এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে। বাসার সামনে ব্যাগ ছিনতাই, দিনের বেলায় মোবাইল বা বিকাশ এজেন্টের দোকানে হামলা, ওয়াকওয়েতে পথরোধ, এমনকি কুরিয়ার গাড়ি থামিয়ে লুটের মতো ঘটনাও যোগ হয়েছে সেই তালিকায়। ফলে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে— মোহাম্মদপুর কি সত্যিই অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে? আর যদি হয়ে থাকে, তবে এই আতঙ্ক কাটবে কবে?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি

শনিবার (২০ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কার্যত সেই বাস্তবতাই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, 'মোহাম্মদপুর বহু বছর ধরে অপরাধীদের একটি ‘ঘাঁটি’ বা ‘অভয়ারণ্য’ হয়ে উঠেছিল। ফলে রাতারাতি পুরো এলাকা অপরাধমুক্ত করা সম্ভব নয়। তবে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে, ধাপে ধাপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই স্বীকারোক্তিই নতুন করে সামনে এনেছে পুরোনো এক প্রশ্ন। মোহাম্মদপুরে অপরাধ কি কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু ছিনতাইয়ের ঘটনা, নাকি এর পেছনে আছে আরও গভীর ও দীর্ঘদিনের অপরাধ কাঠামো? যদি সত্যিই এলাকা ‘অভয়ারণ্য’ হয়ে থাকে, তাহলে এতদিনে সেটি গড়ে উঠলো কীভাবে? আর এখন সেটি ভাঙা হবে কীভাবে?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিরাপত্তা জোরদারের আশ্বাস

একই প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজও নিরাপত্তা জোরদারের আশ্বাস দিয়েছেন। শুক্রবার (১৯ জুন) মোহাম্মদপুরের সূচনা কমিউনিটি সেন্টারে নাগরিকদের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনায় তিনি বলেন, 'এলাকায় টহল বাড়ানো হচ্ছে এবং দ্রুত কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠন করা হবে।' সরকারের নাম ব্যবহার করে কেউ অন্যায় করলে— তা সহ্য করা হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কমিউনিটি পুলিশিং কি কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, নাকি এটি হবে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশলের অংশ? কারণ, মোহাম্মদপুরের বর্তমান বাস্তবতা বলছে— অপরাধ এখন আর শুধু রাতের অন্ধকারের বিষয় নয়, দিনের আলোয়, বাসার সামনে, দোকানে, গলিতে, পথের ওপর— সবখানেই তা দৃশ্যমান।

ছিনতাইয়ের কৌশলগত রূপ

মোহাম্মদপুরে সাম্প্রতিক অপরাধচিত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ছিনতাইয়ের ধারাবাহিকতা এবং তার কৌশলগত রূপ। ঈদুল আজহার ছুটি শেষে গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় ফেরা দুই বোন নূরজাহান রোডে নিজেদের বাসার সামনে নামার পর অস্ত্রের মুখে লাগেজ, ব্যাগ ও মোবাইল ফোন খোয়ান। তদন্তে পুলিশ জানায়, একটি চক্র পিকআপভ্যান নিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ বুঝে চাপাতি দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তারা মালামাল ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে পিকআপভ্যান, চাপাতি ও ছিনতাই হওয়া কিছু মালামাল।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেফতাররা পেশাদার ছিনতাইকারী। তাদের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলা ছিল। তারা গ্রেফতারও হয়েছিল, কিন্তু জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এই তথ্যই মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে— গ্রেফতার হচ্ছে, কিন্তু চক্র ভাঙছে না; মামলা হচ্ছে, কিন্তু অপরাধের পুনরাবৃত্তি থামছে না।

শুধু একটি ঘটনাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ের একের পর এক অভিযোগে উঠে এসেছে একই ধরণের কৌশল—দলবদ্ধ হামলা, ধারালো অস্ত্রের ভয়, দ্রুত ছিনতাই এবং দ্রুত এলাকা ত্যাগ। কোথাও টার্গেট পথচারী, কোথাও দোকান, কোথাও বা বাড়ির সামনে নামা যাত্রী। এর অর্থ, অপরাধীরা শুধু সুযোগ নিচ্ছে না; তারা এলাকা, সময় ও দুর্বল টার্গেট সম্পর্কে পূর্বপরিকল্পিত ধারণা নিয়েই নামছে।

সংগঠিত অপরাধ কাঠামো

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে পুলিশের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রেই দলবদ্ধভাবে কাজ করছে। তাদের হাতে থাকছে ধারালো অস্ত্র। টার্গেট বাছাই, হামলার সময়, পালানোর পথ— সবকিছুই আগেভাগে ঠিক করা থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় সরে গিয়ে অপরাধ করছে, যাতে স্থানীয় নজরদারি বা পরিচিত মুখের ঝুঁকি কমে। ফলে মোহাম্মদপুরের ছিনতাই আর কেবল ‘সুযোগসন্ধানী অপরাধ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর বড় অংশই সংগঠিত, নেটওয়ার্কভিত্তিক এবং চলমান অপরাধ কাঠামোর অংশ বলেই মনে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কথাবার্তায় বারবার উঠে আসে কয়েকটি অভিন্ন অভিযোগ। মাদক কারবার, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা। এই উপাদানগুলো একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে একটি জটিল অপরাধ-পরিবেশ তৈরি করেছে। যেখানে ছিনতাই কেবল দৃশ্যমান উপসর্গ। ভেতরে কাজ করছে আরও গভীর নেটওয়ার্ক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য

র‍্যাব-২ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দুর্বল নয়। তবে অপরাধীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। সে কারণেই অভিযোনের কৌশল পরিবর্তন করা হচ্ছে, যাতে ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। তিনি বলেন, 'শুধু গ্রেফতার করলেই হবে না, দ্রুত তদন্ত, বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে আরও আস্থা পাবে।'

তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) জুয়েল রানাও জানিয়েছেন, আলোচিত কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসায় বিষয়টি পুলিশের আয়ত্তের বাইরে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি

গ্রেফতার হচ্ছে, কিন্তু ভয়ের আবহ কাটছে কোথায়? আলোচিত কয়েকটি ঘটনায় দ্রুত অভিযান হলেও, প্রতিদিনের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি কেন কমছে না। বাসার সামনে নামা, রাতের বাজার শেষে ঘরে ফেরা, কিংবা গলির মুখে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলা— এসব সাধারণ কাজও যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিচ্ছিন্ন সাফল্য মানুষের কাছে কতটা বাস্তব স্বস্তি তৈরি করতে পারছে? এই আতঙ্কই বা কাটবে কবে?