মাদারীপুরে আধিপত্য সংঘাতের রক্তাক্ত অধ্যায়: ডিশ ব্যবসায়ী হত্যা ও ৩০ বসতঘরে অগ্নিসংযোগ
মাদারীপুরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। আলমগীর হাওলাদার নামের এক ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসায়ীকে হত্যার জের ধরে প্রতিপক্ষের অন্তত ৩০টি বসতঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এই পরপর দুটি ঘটনায় পুরো এলাকা এখন পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ঘটনার ক্রমবিকাশ: হত্যা থেকে অগ্নিসংযোগ
মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে সদর উপজেলার নতুন মাদারীপুর এলাকায় আলমগীর হাওলাদারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় তার ডান হাতের কবজি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। হামলাকারীরা তার ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেছিল। একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রতিপক্ষের বসতঘরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং লুটপাট চালানো হয়।
নিহত আলমগীর হাওলাদার মাদারীপুর পৌরসভাধীন ২ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন মাদারীপুর এলাকার মৃত হাফেজ হাওলাদারের ছেলে। তিনি পেশায় একজন ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসায়ী ছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে সদর উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি শাকিল মুনশি হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রাজনৈতিক আধিপত্যের পটভূমি
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নতুন মাদারীপুর এলাকাটির একটি অংশ পড়েছে মাদারীপুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে। এই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান আক্তার হাওলাদার দীর্ঘদিন ধরে নতুন মাদারীপুর এলাকায় এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ওই এলাকায় সদর উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি শাকিল মুনশির আধিপত্য দেখাতে শুরু করেন।
২০২৫ সালের ২৩ মার্চ নতুন মাদারীপুর এলাকায় শ্রমিক দলের একটি কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে শাকিল মুনশিকে কুপিয়ে হত্যা করে মনিরুজ্জামানের লোকজন। যদিও হত্যাকাণ্ডের আগেই মনিরুজ্জামান কারাগারে ছিলেন। তবে রাজনৈতিক বিরোধ থাকায় শাকিল হত্যা তাকে ও তার ছেলেকে আসামি করা হয়। এ মামলার আসামি ছিলেন মনিরুজ্জামানের চাচাতো ভাই নিহত আলমগীর হাওলাদারও।
সংঘাতের তীব্রতা ও স্থানীয়দের আতঙ্ক
মনিরুজ্জামান লোকজনের এলাকায় প্রবেশ করাকে কেন্দ্র করে নিহত শাকিল মুনশির ভাই হাসান মুনশির নেতৃত্বে সম্প্রতি অন্তত দশবার রাতভর টর্চলাইট জ্বালিয়ে ধাওয়া ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। প্রতিবার হামলায় উভয় পক্ষ অসংখ্য হাতবোমা নিক্ষেপ করে নিজেদের আধিপত্য দেখায়, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়েছে।
এ বিরোধের জের ধরেই মনিরুজ্জামানের চাচাতো ভাই আলমগীর হাওলাদারের বসতঘরে ঢুকে হামলা চালান প্রতিপক্ষ হাসান মুনশি ও তার লোকজন। এ সময় আলমগীরকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর জেরে সন্ধ্যায় হাসান মুনশির গ্রুপের অন্তত ৩০টি বসতঘর ভাঙচুর-লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। হত্যাকাণ্ড ও আগুনের এই পাল্লাপাল্টি ঘটনায় আতঙ্কে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পুলিশের তদন্ত ও গ্রেফতার
বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন এবং দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন। তিনি জানান, সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে।
নিহত আলমগীর হাওলাদারের বোন লাইজু আক্তার বলেন, ‘আমার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই। আমাদের কেউ হাসান মুনশির লোকজনের বসতঘরে আগুন দেয় নাই। আগুন নিজেরাই ধরিয়ে আমাদের নামে অপবাদ দিচ্ছে।’
ক্ষতিগ্রস্ত হামুমন নেছা বলেন, ‘আমার ছেলে বিদেশে থাকে। কোনও দলবল করে না। অথচ রাতের বেলা এসে আমাদের বসতঘর ভাঙচুর-লুটপাট করে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমি এর বিচার চাই।’
বাচ্চু হাওলাদারের মেয়ে ডালিয়া আক্তার বলেন, ‘আমাদের ঘরে কিছুই নেই। সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে গেছে। বেঁচে থাকার জন্য শুধু এখন আছে পরনের কাপড়। আমরা এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে মুক্তি চাই।’
পুলিশের পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থা
ঢাকা রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলায় এজাহারনামীয় আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান চলমান আছে। এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পুলিশ কাজ করছে। বাড়ানো হয়েছে টহল। জেলা প্রশাসনকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ আর কোনও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’
এদিকে আলমগীর হাওলাদার হত্যার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সদর মডেল থানায় ৮৬ জনের নামে মামলা করলে দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অপরদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মাদারীপুর পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান আক্তার হাওলাদারকে আটক করা হয়েছে।
সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ জানান, আলমগীর হাওলাদারকে হত্যার পর প্রতিপক্ষ হাসান মুনশিসহ তার লোকজন এলাকাছাড়া। এই সুযোগে একটি পক্ষ রাস্তাঘাট অবরোধ করে প্রতিপক্ষের সমর্থিত কয়েকটি বাড়িঘরে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন দিয়েছে। মঙ্গলবার ইফতারের পরেই এ ঘটনার সূত্রপাত। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও র্যাবের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
