কুরবানির ইতিহাস ও ঐতিহ্য: ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত
কুরবানির ইতিহাস ও ঐতিহ্য: ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত

কুরবানির ইতিহাস ও ঐতিহ্য

কুরবানি মুসলিম উম্মাহর একটি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর ইতিহাস অতি প্রাচীন এবং কুরআনে হাবিল-কাবিলের ঘটনা এর প্রমাণ বহন করে। ইসলামে প্রথম কুরবানি হাবিলের, যিনি আল্লাহর জন্য একটি ভেড়া কুরবানি করেন। অন্যদিকে তার ভাই কাবিল তার ফসলের কিছু অংশ স্রষ্টার উদ্দেশ্যে নিবেদন করেন। সে সময় আল্লাহর নির্ধারিত শরিয়ত ছিল যে, আকাশ থেকে আগুন নেমে এসে কবুলকৃত কুরবানি গ্রহণ করবে। হাবিলের পশু কবুল হয়, কিন্তু কাবিলের ফসল প্রত্যাখ্যাত হয়।

কুরআনে এই ঘটনা সুরা মায়েদার ২৭ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে: 'আর তুমি তাদের কাছে আদমের দুই পুত্রের সংবাদ যথাযথভাবে বর্ণনা কর, যখন তারা উভয়ে কুরবানি পেশ করল। এরপর তাদের একজন থেকে গ্রহণ করা হলো, আর অপরজন থেকে গ্রহণ করা হলো না। সে বললো, অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করবো। অন্যজন বললো, আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদের থেকে গ্রহণ করেন।'

ইবরাহিম (আ.)-এর কুরবানি

পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা ইসলামের নবি ও রাসুল, মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিমকে (আ.) স্বপ্নযোগে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কুরবানি করার নির্দেশ দেন। তিনি প্রথমে ১০টি উট কুরবানি করেন, তারপর ১০০টি উট কুরবানি করেন। কিন্তু পুনরায় আদেশ পেয়ে তিনি বুঝতে পারেন যে, তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু হলো তার পুত্র ইসমাইল (আ.)। তিনি ইসমাইলকে (আ.) কুরবানি করতে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। যখন তিনি পুত্রের গলায় ছুরি চালানোর চেষ্টা করেন, তখন তিনি দেখেন যে ইসমাইলের পরিবর্তে একটি প্রাণী কুরবানি হয়েছে। এই ঘটনা সুরা আস-সাফফাতের ১০২-১০৩ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে বিশ্বের মুসলিমরা প্রতি বছর ঈদুল আজহা উৎসব পালন করে। ইসলামে হিজরি ক্যালেন্ডারের ১২তম চন্দ্রমাস জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করার সময় নির্ধারিত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কুরবানির তাৎপর্য

কুরবানি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত। সামর্থ্য থাকলে কুরবানি আদায় করা উত্তম এবং কোনোভাবেই কুরবানি থেকে বিরত না থাকা উচিত। সক্ষম হলে নিজের ও পরিবার-পরিজনের পক্ষ থেকেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করা যায়। এর মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশ মানা হয় এবং সাহাবাদের অনুসরণ ও অনুকরণ হয়। ফলে এতে রয়েছে বিশাল সওয়াব।

কুরবানির পর পরিবার ও দরিদ্রজনের মধ্যে পশুর গোশত বিতরণ করা হয় এবং আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের জন্য হাদিয়া ও উপঢৌকন পেশ করার সুযোগ হয়। কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য করতে পেরে মুমিন আনন্দ পায়, যা কুরবানির প্রকৃত খুশি।

কুরবানি না করে কুরবানির টাকা গরিব-দুঃখীর মাঝে বণ্টন করে দিলে কুরবানির হক আদায় হবে না। কারণ কুরবানিতে আল্লাহর জন্য পশু জবাই করা ইবাদত ও দ্বীন ইসলামের নির্দশন এবং প্রতীক। ইমাম ইবনে তাইমিয়া বলেন, 'কুরবানি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ এবং সমগ্র মুসলিম জাতির এক আমল। আর কোথাও কথিত নেই যে, তাঁদের কেউ কুরবানির পরিবর্তে তার মূল্য সাদকাহ করেছেন। আবার যদি তা উত্তম হতো তবে তাঁরা নিশ্চয়ই তার ব্যতিক্রম করতেন না।' (ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া)

কুরআন-সুন্নায় কুরবানির নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা কুরআনে কুরবানি সম্পর্কে বলেছেন: 'অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের জন্য নামাজ পড় এবং কুরবানি কর।' (সুরা কাউসার: আয়াত ২) এবং 'বলুন, অবশ্যই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই।' (সুরা আনআম: আয়াত ১৬২) আরও বলেন, 'তারা কতক নির্দিষ্ট দিনে গৃহ পালিত চতুষ্পদ জন্তুর মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করে।' (সুরা হজ: আয়াত ২৮) এবং 'আল্লাহর কাছে (কুরবানির পশুর) গোশত ও রক্ত পৌঁছে না বরং তোমাদের অন্তরের তাকওয়া পৌঁছে থাকে।' (সুরা হজ: আয়াত ৩৭)

হাদিসে হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'কুরবানির দিন পশু কুরবানির চাইতে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো আমল নেই। কেয়ামতের দিন জবাই করা পশুকে তার শিং ও খুরসহ হাজির করা হবে। কুরবানির জন্তুর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা খোলা মনে এবং সন্তুষ্টি চিত্তে কুরবানি কর।' (মেশকাত)

সুতরাং কুরআন-সুন্নার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী অর্থ দিয়ে নামাজ ও কুরবানির ইবাদত আদায় করলে হবে না। হজের ক্ষেত্রে যারা তামাত্তু ও কিরান হজ করবেন, তারা যদি কুরবানির পরিবর্তে তিনগুণ বা তারচেয়েও বেশি সাদকাহ করে তাতে তার বিনিময় হবে না। ঠিক কুরবানিও তাই। আর আল্লাহ তাআলাই বেশি জানেন।

কুরবানি নামাজের মতো স্বাতন্ত্র ইবাদত। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে কুরবানির গুরুত্ব, ফজিলত ও সাওয়াব অনেক বেশি। এটা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নাত হওয়ার কারণে নবীজি (সা.) নিজে তা পালন করেছেন। তাই উম্মতে মুহাম্মাদির সামর্থ্যবানদের জন্যও তা আদায় করা আবশ্যক।