জেলে যাওয়ার কৌতূহলে শিশু হত্যা: নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ঘটনা
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় জেলে যাওয়ার কৌতূহলে এক নিরপরাধ শিশুকে হত্যার ঘটনা সারা দেশে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ঘটনাটি এতটাই লোমহর্ষক যে, তা গোয়েন্দা কাহিনী বা সিনেমাকেও হার মানায়। মাদকের সহজলভ্যতা ও পারিবারিক অবহেলা কিশোরদের এমন ভয়াবহ অপরাধের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ঘটনার বিবরণ
গত ১৯ এপ্রিল ফতুল্লা রেলস্টেশন এলাকায় ৬ কিশোর বন্ধু মিলে গাঁজা সেবন করে। রাতে বাড়ি না ফেরায় তারা পরিবারের কাছ থেকে মারধর খায়। এরপর ২০ এপ্রিল রাতে তারা আবার একত্রিত হয় এবং জেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা মনে করে, জেলে গেলে আর বাড়িতে মারধর খেতে হবে না। জেলে যাওয়ার জন্য তারা একটি খুনের পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা স্থানীয় ফুল বিক্রেতা সুমনের ছেলে ১১ বছর বয়সী হোসাইনকে গাঁজা খাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে রাত সাড়ে ১১টার দিকে তারা হোসাইনকে গলা টিপে হত্যা করে এবং পেটে চাকু দিয়ে আঘাত করে। হত্যার পর তারা নিজেদের শরীর থেকে রক্ত মুছে ফেলে এবং আবার গাঁজা সেবন করে বাড়ি চলে যায়।
গ্রেফতার ও তদন্ত
হত্যার পর আসামিরা তাদের আরেক বন্ধু ইয়াসিনকে লাশের খোঁজখবর নেওয়ার দায়িত্ব দেয়। ইয়াসিন ২৪ এপ্রিল লাশ দেখতে গেলে স্থানীয় লোকজন তাকে সন্দেহ করে আটক করে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৬ আসামিকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা সবাই মাদকাসক্ত এবং বখাটে প্রকৃতির বলে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সি জানান, আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। তাদের কোনো পূর্ব বিরোধ ছিল না; শুধুমাত্র জেলে যাওয়ার কৌতূহল থেকেই তারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ঢাকা বিভাগ সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, রাষ্ট্রের দুর্বল কাঠামো ও মাদকের সহজলভ্যতা শিশুদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
ফতুল্লা থানার ওসি মাহবুব আলম জানান, আসামিদের পরিবার নিম্নআয়ের এবং তারা রিকশা চালানো বা দিনমজুরির মতো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। বাবা-মায়ের কঠোর শাসনের অভাবে তারা অল্প বয়সেই বখাটে ছেলেদের সংস্পর্শে আসে এবং মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।
আইনি প্রক্রিয়া
নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক মো. আব্দুস সামাদ জানান, আসামিরা বয়সে কিশোর হওয়ায় তাদের গাজীপুরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। পলাতক আরেক আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে, মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন ও পারিবারিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায়, ভবিষ্যতে আরও শিশু অপরাধের শিকার হতে পারে।



