ভুয়া জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকদের চার নির্দেশনা
ভুয়া জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনে জেলা প্রশাসকদের চার নির্দেশনা

ভুয়া জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকদের চার নির্দেশনা

প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দেশের সব জেলা প্রশাসককে চারটি নির্দেশনা সম্বলিত চিঠি পাঠিয়েছে। গত ২৭ জানুয়ারি পাঠানো এই চিঠিতে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রম আইন ও বিধির আলোকে সম্পাদন হচ্ছে কি না, তা তদারক, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, অসংগতি দূর করা এবং টাস্কফোর্সের সভা নিয়মিত আয়োজনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন ও উদ্বেগ

চিঠিতে প্রথম আলোর প্রতিবেদনের বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়, ‘সম্প্রতি “দৈনিক প্রথম আলো” পত্রিকায় মাঠপর্যায়ে কতিপয় নিবন্ধকের মাধ্যমে বিধিবহির্ভূতভাবে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন করার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, যা উদ্বেগজনক এবং জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।’ গত ২৬ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে ‘প্রথম আলোর অনুসন্ধান, শিশুর ভুয়া জন্ম-মৃত্যু দেখিয়ে নিবন্ধনের লক্ষ্যপূরণ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে ৫০৯টি ভুয়া নিবন্ধনের তথ্য তুলে ধরা হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তদন্ত ও প্রমাণ

প্রথম আলোর প্রতিবেদনের সত্যতা পাওয়া গেছে জানিয়ে গত ৮ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বিশদ তদন্ত প্রতিবেদন পাঠান। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর ও বুধল, কসবা উপজেলার কুটি এবং আশুগঞ্জ উপজেলার চরচারতলা ইউনিয়ন থেকে ২৫৮টি জন্মনিবন্ধন ও ২৫১টি মৃত্যুনিবন্ধনসহ মোট ৫০৯টি তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গত বছরের ১০ থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৫টি ইউনিয়ন ঘুরে তথ্য যাচাই করে প্রথম আলো ৪টি ইউনিয়নে ব্যাপক জালিয়াতির প্রমাণ পায়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা

‘জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রমের তদারকি ও যথাযথ বাস্তবায়ন’ শিরোনামের চিঠিতে চারটি নির্দেশনা দেওয়া হয়:

  1. জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন–সংক্রান্ত সব কার্যক্রম প্রচলিত আইন ও বিধিমালার আলোকে সম্পাদিত হচ্ছে কি না, তা তদারক করতে হবে।
  2. জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
  3. নিবন্ধন কার্যক্রমের অগ্রগতি–সংক্রান্ত মাসিক প্রতিবেদন পাঠানোর আগে প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত তথ্যগুলো যাচাই করতে হবে, কোনো অসংগতি থাকলে তা দূর করার পদক্ষেপ নিতে হবে।
  4. জেলা জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন টাস্কফোর্সসহ বিভিন্ন পর্যায়ের টাস্কফোর্সের সভা নিয়মিতভাবে আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে।

প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও পদক্ষেপ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান প্রথম আলোকে জানান, প্রতিবেদন প্রকাশের পর তিনি ১০০টি ইউনিয়নে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কাজে যুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের সচিব, চেয়ারম্যান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা করেছেন। ভুয়া নিবন্ধন চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে ভুয়া নিবন্ধনের সঙ্গে জড়িত চার প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে।

জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা থেকে পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়গুলো রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয় পর্যবেক্ষণ করবে।

প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন টার্গেট পূরণ নিয়ে চাপ দেওয়া হচ্ছে না, বরং ভুয়া নিবন্ধন না করার জন্য বারবার বলা হচ্ছে। ১১ জানুয়ারি এক সভায় জেলা প্রশাসক প্রকৃত তথ্য অনুযায়ী নিবন্ধন করার নির্দেশ দেন। এই ঘটনা জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।