দীর্ঘ এক বছর কারাবরণ শেষে জামিনে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তবে তার বাড়ি ফেরাকে কেন্দ্র করে নজরদারি বৃদ্ধি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ কারণে তার বাড়ির সামনে পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধি ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকায় সাবেক মেয়র আইভীর সামনের সড়ক ঘুরে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ
দেওভোগ এলাকার বাসিন্দা কচি আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় আগে কখনও সিসি ক্যামেরা দেখিনি। বুধবার রাতে সাবেক মেয়র আইভী বাড়ি ফিরে আসলে পুরো এলাকায় পুলিশের টহল দেখা গেছে। সাধারণ জনগণকে এলাকায় ঘুরাফিরা করতে দেয়নি পুলিশ। এর পাশাপাশি আইভীর বাড়ির গেটের সামনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা দিপা রানী দাস বলেন, ‘সাবেক মেয়র আইভীর ওপর নজরদারি রাখার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। সাবেক মেয়র আইভী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় এ ধরনের নজরদারি রাখা হচ্ছে।’
আইনজীবীর বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক মেয়র আইভীর আইনজীবী আওলাদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা নিরাপত্তার জন্য করা হয়েছে। বিষয়টিকে পজিটিভলি দেখছি। কারণ এখানে সাবেক মেয়র আইভীর কোনও রকম সমস্যা হলে পুলিশ প্রশাসনের ওপরে এর দায় যাবে। এ কারণে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে তার বাড়ির সামনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও পুলিশের অতিরিক্ত টহল রাখা হয়েছে।’
পুলিশের ব্যাখ্যা
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাজেদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই সিসি ক্যামেরা আইভীকে টার্গেট করে স্থাপন করা হয়নি। অপরাধীদের দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধি করতে জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।’
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দলের কোনও কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সাবেক মেয়র আইভী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তবে তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনও দলের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না, এমনটি করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বলেন, ‘সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর রাতেই তার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ওই এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। তাছাড়া তিনি নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনও কার্যক্রমে যাতে জড়িয়ে না পড়েন সেটি আমাদের নজরদারিতে রয়েছে। এজন্য ওই এলাকায় সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।’
সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সাবেক মেয়র আইভীর বাড়িকে কেন্দ্র করে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়নি। জেলার বিভিন্ন স্থানে অপরাধমুক্ত রাখতে বিভিন্ন এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া পুরো নারায়ণগঞ্জে প্রায় দুই হাজার ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।’
আইভীর কারামুক্তি ও জামিনের প্রক্রিয়া
এর আগে বুধবার রাত ১০ টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় নারী কারাগার থেকে তিনি জামিনে মুক্তি পান। জামিনে মুক্তি পেয়ে নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ এলাকায় তার নিজ বাড়ি চুনকা কুটিরে ফিরে আসেন। তিনি বাড়িতে প্রবেশ করে আঙিনায় থাকা খানকা শরীরের ভেতরের মাজার জিয়ারত করেন। পরে স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তার আত্মীয় স্বজনরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এদিকে তার উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে বাড়ির চারপাশে ও পুরো এলাকায় পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা বলয় ছিল চোখে পড়ার মতো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৭ মে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সর্বশেষ দুটি মামলাতেও আইভীর হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রেখেছিলেন। এর ফলে তার বিরুদ্ধে থাকা মোট ১২টি মামলার সবকটিতেই জামিন মঞ্জুর হয়েছিল এবং কারামুক্তিতে আর কোনও আইনি বাধা ছিল না।
এর আগে ১০ মামলায় হাইকোর্টে জামিন মঞ্জুরের পর সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওই দুটি মামলায় আইভীকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এর মধ্যে ২ মার্চ একটি মামলায় এবং ১২ এপ্রিল অপর মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুই মামলায় ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট রুল দিয়ে আইভীকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। এই জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক আবেদন করে। আবেদন দুটি চেম্বার আদালতের রবিবারের কার্যতালিকায় ৪১ ও ৪২ ক্রমিকে ওঠে।
গত বছরের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসা থেকে আইভীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় হওয়া তিনটি হত্যা মামলা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এই পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট গত বছরের ৯ নভেম্বর আইভীর জামিন মঞ্জুর করে রায় দেন। এ জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে পৃথক পাঁচটি আবেদন করে। চেম্বার আদালত গত বছরের ১২ নভেম্বর হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠান। এর ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক পাঁচটি লিভ টু আপিল করে। লিভ টু আপিলগুলো খারিজ করে ১০ মে আদেশ দেন আপিল বিভাগ। ফলে পাঁচ মামলায় আইভীর জামিন বহাল থাকে।
তবে প্রথম দফার ওই পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট জামিন দেওয়ার পর আইভীকে আরও পাঁচ মামলায় গত বছরের নভেম্বরে গ্রেফতার দেখানো হয়। এই পাঁচ মামলার মধ্যে চারটি ফতুল্লা থানায় করা হত্যা মামলা। অপরটি হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় করা মামলা।
দ্বিতীয় দফার পাঁচ মামলায় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট জামিন প্রশ্নে রুল দিয়ে আইভীকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। গত ৫ মার্চ চেম্বার আদালত শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনগুলো আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠান। দ্বিতীয় দফার এই পাঁচ মামলায় আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা পৃথক লিভ টু আপিল ১০ মে আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ওঠে। সেদিন আপিল বিভাগ আইভীর জামিনে ইতিপূর্বে চেম্বার আদালতের দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে হাইকোর্টে রুল (জামিন প্রশ্নে) নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের পৃথক পাঁচটি লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে এ আদেশ দেওয়া হয়। ফলে দ্বিতীয় দফার পাঁচ মামলায় আইভীকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল হয়।
আইভীর আইনজীবী আওলাদ হোসেন বলেন, ‘১২ মামলায় আইভীকে হাইকোর্ট থেকে জামিন দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় তাকে পুনরায় কারাগারে নেওয়ার সুযোগ নেই।’
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে ২০১১, ২০১৬ ও ২০২২ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী হন তিনি। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পটপরিবর্তন হলে ওই বছরের ১৮ আগস্ট আইভীকে মেয়র পদ থেকে অপসারণ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।



