বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে, বাংলাদেশের সীমান্ত উন্মুক্ত করার প্রায় নয় বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৭ সালে মানবতার এক অনন্য নিদর্শন স্থাপন করে বাংলাদেশ লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল, যারা মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে এসেছিল।
সংকটের বাস্তবতা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংকটকে 'দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা' হিসেবে ধরে নেওয়া সহজ। কিন্তু কক্সবাজারে এখনও নতুন পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে আসছে, সঙ্গে নিয়ে আসছে অনিরাপত্তা, সহিংসতা, জোরপূর্বক নিয়োগ ও ভীতির গল্প। ২০২৩ সালের শেষ থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘাতের কারণে বর্তমান সংঘাতের চক্রটি ২০১৭ সালের থেকে ভিন্ন। রোহিঙ্গারা আবারও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাদের ঘরছাড়া হতে হচ্ছে এবং নিরাপত্তার সন্ধানে প্রাণঘাতী পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে।
মানবতার নতুন সুযোগ
বাংলাদেশ যখন ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, তখন ২০১৭ সালের মতো আরেকটি মানবিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সহিংসভাবে নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে কেন্দ্রে রাখা যেতে পারে। বর্তমানে কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে। অনেকে বছরের পর বছর ধরে অতিরিক্ত ভিড়পূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছে, যেখানে চলাফেরা, আয় বা ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ সীমিত।
সহনশীলতার সীমা
হুবাইব নামে এক রোহিঙ্গা শরণার্থী বলেন, 'বিশ্ব শরণার্থী দিবসে আমরা, যাদের 'শরণার্থী' বলে চিহ্নিত করা হয়, বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিই যে আমরাও মানুষ। আমরা মর্যাদা, সুরক্ষা এবং জীবন পুনর্গঠনের সমান অধিকার পাওয়ার দাবি রাখি।' তিনি আরও বলেন, 'বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক বক্তৃতায় রোহিঙ্গাদের 'সহনশীলতা'র প্রশংসা করা হয়েছে। কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে অতিরিক্ত ভিড়পূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রে বন্দি থাকার পর এই বক্তব্য ক্রমশ অন্যায় হয়ে উঠছে। বিশ্ব যা টেকসই সহনশীলতা বলে ভুল করে, তা আসলে বেঁচে থাকার এক ক্লান্তিকর ও ব্যয়বহুল ইচ্ছা।'
আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক
জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সহনশীলতা ও আত্মনির্ভরশীলতাকে মর্যাদা ও আশা বজায় রাখার জন্য জরুরি বলে জোর দেয়। কিন্তু সংকটের প্রায় এক দশক পরও অধিকাংশ রোহিঙ্গা শরণার্থীর কাজ করার, চলাফেরা করার, উচ্চশিক্ষা অর্জনের বা নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অর্থবহ সুযোগ নেই। মিয়ানমারে মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের কংক্রিট পথ ও সমাধানের অভাবে সহনশীলতা ও আত্মনির্ভরশীলতার প্রতিশ্রুতি খালি কথায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চাপের মুখে মানবিক সহায়তা
প্রয়োজনীয়তা এখনও অনেক বেশি, সমাধান এখনও দূরে, এবং মানবিক সহায়তা আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। মেডিসিনস স্যান ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) এর চিকিৎসক দল সংক্রামক রোগ, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, মাতৃস্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে এমএসএফ ৪,৩৮,৮০৫টি বহির্বিভাগের সেবা ও ১,১৮,৯২৯টি জরুরি সেবা প্রদান করেছে। এছাড়া ৭৫,৫৮৩টি মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোরোগ সেবা, ৪,৫৪৭টি প্রসব সেবা, ডায়াবেটিসের জন্য ১৮,৪৭৭টি সেবা এবং হেপাটাইটিস সি-তে আক্রান্ত ১৫,২৯৩ জন রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার ৩,৫১৫ জন এবং সহিংসতাজনিত আঘাতে ৩,৪৯৩ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা ঘটনা ও সহিংসতা এখনও উদ্বেগের বিষয়। রাখাইন রাজ্যে সংঘাত চলাকালে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা দূরেই রইল। এমএসএফ জাতিসংঘের মানবিক তহবিল থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করলেও, সামগ্রিক মানবিক সহায়তায় অর্থ হ্রাসের প্রভাব রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর পড়তে পারে বলে তারা উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন, শিক্ষা, সুরক্ষা ও খাদ্য সহায়তার মতো মৌলিক সেবায় চাপ বাড়ছে, যা শুধু রোহিঙ্গা নয়, কক্সবাজারের স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপরও পড়ছে।
বাংলাদেশের ভূমিকা
গত বছর জাতিসংঘে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের কাছে আবারও সুযোগ রয়েছে অর্থবহ রাজনৈতিক পদক্ষেপের দাবি জানানোর – এমন পদক্ষেপ যা ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের মানবিক অঙ্গীকারকে শক্তিশালী করবে, দুর্বল নয়।
এলকো ব্রুমেলম্যান বাংলাদেশে এমএসএফ-এর দেশ প্রতিনিধি, এর আগে ২০২৫ সাল থেকে কক্সবাজারে এমএসএফ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মুহাম্মদ হুবাইব একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী যিনি ২০১৭ সালে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। তিনি ক্যাম্পে এমএসএফ-এর দলের অংশ এবং স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গা যুবকদের শিক্ষা দেন। ২০২৪ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শরণার্থী উচ্চশিক্ষা প্রবেশাধিকার কর্মসূচি (RhEAP) শেষ করে তিনি ২০২৫ সালে বার্ড কলেজে রাজনৈতিক বিজ্ঞান অনলাইন ডিগ্রির জন্য নির্বাচিত হন।



