গাইবান্ধায় সম্পদ লিখে দিয়েও বৃদ্ধ দম্পতির ওপর নির্যাতনের মর্মান্তিক ঘটনা
গাইবান্ধার পলাশবাড়ি উপজেলায় এক মর্মান্তিক ঘটনায় বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি তাদের পুত্র ও পুত্রবধূর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কোটি টাকার সম্পদ লিখে দিয়েও তারা এই অমানবিক আচরণ থেকে রক্ষা পাননি। ঘটনায় জড়িত প্রধান শিক্ষিকা পুত্রবধূকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সম্পদ লিখে দেওয়ার পরও নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে
মহদীপুর ইউনিয়নের ঝালিঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী মাহবুব ইসলাম দোলন ও তার ৭০ বছর বয়সী স্ত্রী হাসনা বেগম দীর্ঘদিন ধরে ছেলের পরিবারের সাথে বসবাস করছিলেন। মাহবুব ইসলাম শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে শুরু হয় পুত্র হাসানুর রহমান ও পুত্রবধূ শিক্ষিকা সোমার নির্যাতন।
নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বৃদ্ধ শ্বশুর তার পৈতৃক সম্পত্তির ৬ বিঘা আবাদি জমি, ৩ বিঘার ৩টি পুকুর ও বসতবাড়ির ১৮ শতক জমিসহ কোটি টাকার সম্পদ পুত্রবধূ সোমা ও ছেলে হাসানুরের নামে লিখে দেন। কিন্তু সম্পত্তি হস্তান্তরের পর থেকেই তাদের ওপর অবহেলা, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
অমানবিক নির্যাতনের বিবরণ
শুধু অযত্ন-অবহেলা নয়, কনকনে ঠান্ডায় বৃদ্ধ দম্পতির লেপ-তোশকে পানি ঢেলে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। গত ৭ জানুয়ারি অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য বাইরে গেলে, তাদের ব্যবহৃত লেপ-তোশক, কাঁথা-বালিশসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঘর থেকে বের করে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়।
স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠক বসলেও ছেলে হাসানুর রহমান ও তার স্ত্রী সোমা শ্বশুর-শাশুড়িকে মারধর করে। একপর্যায়ে পুত্রবধূ সোমা তার শ্বশুরকে হত্যাচেষ্টা করে। চিৎকার শুনে লোকজন এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করে।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও আইনি ব্যবস্থা
বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ জাবের আহমেদ ও পলাশবাড়ী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বৃদ্ধ দম্পতির থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। পিতা মাহবুব ইসলাম দোলন বাদী হয়ে পলাশবাড়ি থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অভিযুক্ত ছেলে হাসানুর রহমানকে গ্রেফতার করে এবং পুত্রবধূ সোমার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।
প্রধান শিক্ষিকার সাময়িক বরখাস্ত
দীর্ঘ তদন্তে ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হলে রংপুর বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় থেকে পলাশবাড়ি উপজেলার বেতকাপা ইউনিয়নের সাতারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা উম্মে মাহবুবা খানম সোমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। গত ৫ এপ্রিল রংপুর বিভাগীয় উপ-পরিচালক আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, পলাশবাড়ী থানায় দায়ের হওয়া মামলায় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ গঠিত হওয়ায় এবং মামলাটি বিচারাধীন থাকায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকালীন সোমা সরকারি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা প্রাপ্য হবেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবেন না।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য
পলাশবাড়ি থানার ওসি সরোয়ারে আলম বলেন, "বৃদ্ধ পিতা-মাতার সম্পত্তি লিখে নিয়ে তাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। তবে শিক্ষা বিভাগ থেকে অভিযুক্ত পুত্রবধূকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।"
স্থানীয় বাসিন্দারা এই অমানবিক ঘটনায় ক্ষুব্ধ। তারা বৃদ্ধ দম্পতির নিরাপদ আশ্রয় ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। ঘটনাটি সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণের গুরুত্বও তুলে ধরেছে।



