প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একনেকের প্রথম বৈঠক: প্রকল্প অনুমোদনে নতুন নীতি
তারেক রহমানের নেতৃত্বে একনেকের প্রথম বৈঠক, নতুন নীতি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একনেকের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা সোমবার (৬ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নতুন সরকার গঠনের পর এটিই হবে একনেকের প্রথম বৈঠক। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিতব্য এই সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমান।

উন্নয়ন দর্শনে বড় পরিবর্তন: চলমান প্রকল্প শেষে জোর

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকারের একনেক সভায় প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মৌলিক কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে ‘বিলাসী’ বা কম গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা এবং অবহেলিত মানুষের দোরগোড়ায় বাজেটের সুফল পৌঁছে দেওয়াই হবে এই সরকারের মূল লক্ষ্য।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ আর সহ্য করা হবে না। পরিকল্পনা উপদেষ্টার অভিমত— নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনও প্রকল্পের কাজ শেষ না হলে সেটির অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়া হবে। সময়মতো কাজ শেষ করার এই বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে সরকার এবার কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অতীতের উন্নয়ন দর্শনে অনেক সময় বড় শিল্প বা উৎপাদন খাতকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষগুলো আলোচনার বাইরে থেকে যেতো। বর্তমান সরকার সেই ধারা ভেঙে অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষের পাওনা ও সামাজিক সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের তথ্য অনুযায়ী, একনেক সভায় ২২টি প্রকল্পের জন্য ৪৬ হাজার ৪১৯ কোটি টাকার যে বিশাল বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তাতে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রান্তিক মানুষের কল্যাণের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৮টি প্রকল্প অনুমোদনের প্রস্তাব: নতুন ও সংশোধিত প্রকল্প

এবারের সভায় মোট ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ১৮টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৯টি সম্পূর্ণ নতুন প্রকল্প এবং বাকিগুলো সংশোধিত বা সময় বৃদ্ধির প্রকল্প।

একনেকে উপস্থাপনের জন্য যেসব প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে—

  • স্থানীয় সরকার বিভাগের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প।
  • চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আবাসিক নিবাস নির্মাণ প্রকল্প।
  • ঢাকা শহরের জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্প।
  • প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সংকট নিরসনে ব্যারাক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প।
  • সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প -২।
  • চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রকল্প-৪।
  • পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অংশীদারত্বমূলক পল্লী উন্নয়ন চতুর্থ পর্ব প্রকল্প।
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে ৮ বিভাগীয় শহরে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন প্রকল্প।
  • গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্প।
  • গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ সচিবালয়ে ২১ তলাবিশিষ্ট নতুন অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্প।
  • পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আইটি ট্রেইনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার স্থাপন প্রকল্প।
  • সড়ক বিভাগের সীমান্ত সড়ক (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা) নির্মাণ প্রকল্প-২য় পর্যায়।
  • ‘ময়মনসিংহ বিভাগে পাঁচটি জলবায়ু সহনশীল সেতু নির্মাণ প্রকল্প’।
  • সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বৈরাগীপুর (বরিশাল)-টুমচর-বাউফল (পটুয়াখালী) জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্প।
  • বরিশাল-ভোলা-লক্ষীপুর জাতীয় মহাসড়কের বরিশাল (চরকাউয়া) থেকে ভোলা (ইলিশা ফেরিঘাট) হয়ে লক্ষীপুর পর্যন্ত সড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্প ইত্যাদি।

এছাড়া পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদিত ৩৩টি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে— সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ৩টি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১টি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১টি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৫টি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৭টি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ৪টি, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ২টি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ১টি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ২টি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ১টি, বিদ্যুৎ বিভাগের ৫টি এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ১টি প্রকল্প রয়েছে।

ব্যয় সংকোচন ও গুণগত মান: বিলাসী প্রকল্পে কড়াকড়ি

বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার বর্তমানে কঠোর ‘ব্যয় সংকোচন নীতি’ অনুসরণ করছে। এর ফলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এর সভায় বিলাসী বা কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদনে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। একনেক নিয়ে সরকারের বর্তমান ভাবনা ও মূল নীতি হচ্ছে— একনেকে নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্কতা ও অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, যেসব প্রকল্পে অর্থের অপচয় বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে বাদ দেওয়া হচ্ছে। নতুন কোনো বিলাসী প্রজেক্ট হাতে না নিয়ে সরকার চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার জন্য চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে। এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) বাস্তবায়নে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে শুধুমাত্র উৎপাদনশীল ও জরুরি প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নতুন ভাবনা: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এই মেয়াদে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে ডিজেল আমদানি এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। উন্নয়নের চমক দেখানোর চেয়ে প্রকল্পের গুণমান নিশ্চিত করা, সময়মতো সমাপ্তি এবং সরাসরি জনকল্যাণ সাধনই এখন একনেকের মূল লক্ষ্য।

প্রকল্পের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, “জ্বালানি সংকট এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। যদিও এটি কোনও একক দেশের সমস্যা নয়। বরং বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশে এখনও দাম বাড়ানো হয়নি। নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণের ওপর চাপ কম রাখতে চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে একসময় এই চাপ বহন করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে। যদি সরকারি তহবিল এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব জনগণের ওপরই পড়বে। তাই বিষয়টি বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

একনেক কমিটি গঠন: ৯ সদস্যের পুনর্গঠিত কমিটি

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানকে সভাপতি এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিকল্প সভাপতি করে ৯ সদস্যের একনেক কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল (স্বাস্থ্য) এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।