শহীদ বিপ্লব হাসানের বাবাকে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ বিপ্লব হাসানের বাবা মো. বাবুলকে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান এই সঞ্চয়পত্র হস্তান্তর করেন।
উপস্থিত কর্মকর্তাদের তালিকা
এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) লুৎফুন নাহার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা) উম্মে হাবীবা মীরা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আজিম উদ্দিন প্রমুখ।
শহীদ বিপ্লব হাসানের স্মৃতিচারণ
২০২৪ সালের ২০ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হন বিপ্লব হাসান। গৌরীপুরে কারফিউ ভেঙে সেদিনের মিছিলের অগ্রভাগে থাকা বিপ্লবের মাথায় পুলিশের বুলেট একদিকে ঢুকে অপরপ্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে যায়।
শহীদ বিপ্লব হাসানের মা বিলকিস আক্তার বলেন, "আমি ঘুমাতে পারি না। বারবার মনে হয়, এই তো বিপ্লব আমাকে ডাকছে। মা, মাগো- আমাকে নাস্তার টাকা দাও! ঘরের এপাশ ওপাশেও ওর পায়ের শব্দ পাই। সে দিনের বুলেটের শব্দের মতো কোনো শব্দ হলেই আমি এখনো আঁতকে উঠি।"
তিনি আরও বলেন, "এই টাকা দিয়ে তো আর আমি আমার বিপ্লব হাসানকে পাব না। তারপরেও সরকারের এ উদ্যোগের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।"
বাবা বাবুল মিয়ার বক্তব্য
শহীদ বিপ্লবের বাবা বাবুল মিয়া বলেন, "ছেলে আমার দেশের জন্য জীবন দিলেও পুলিশের চাপে ছেলের শান্তিপূর্ণ জানাজাও দিতে পারি নাই।"
বাড়ির পাশেই ছেলেকে কবরস্থ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, "ছেলের জানাজার পর প্রতিদিনই বাড়িতে পুলিশ আইতো, পুলিশের ডরে বাড়ি ছাইড়া আমি দিন-রাইত বাইরে থাকতাম।"
তিনি আরও বলেন, "হাসিনা সরকারের পতন না অইলে মনে হয় ছেলের আন্দোলন করার অপরাধে আমার বাকি জীবন জেলেই থাকতে অইত।"
আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের বিবরণ
আন্দোলনের সহযোদ্ধা বাহালুল মুনশী বলেন, "পুলিশের প্রথমে গুলি শেষ হয়ে যায়। এরপরে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আর পুলিশ আরও গুলি সংগ্রহ করে সংঘবদ্ধভাবে ছাত্র-জনতার ওপর বুলেট চালায়। আমার সামনেই গুলিবিদ্ধ হয় বিপ্লব। সে ডৌহাখলা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সদস্য ছিল।"
ইউনিয়ন ছাত্রদল নেতা মো. বিল্লাল মিয়া জানান, "আন্দোলনের সময় এসআই শফিকুল ইসলাম আন্দোলনে থাকা বিপ্লব হাসানকে টার্গেট করে খুব কাছ থেকে গুলি চালায়। এতে গৌরীপুর-কলতাপাড়া সড়কের ডেলটা মিলসংলগ্ন মসজিদের কাছাকাছি সড়কে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।"
তিনি আরও বলেন, "এ সময় আমরা কয়েকজন এগিয়ে গেলে পুলিশ আরও বেপরোয়া হয়ে গুলি চালাতে থাকে। এতে আমরা পেছনে সরে আসি। তখন এসআই শফিকুল ইসলাম সড়কে পড়ে থাকা বিপ্লবের মাথায় পরপর আরও দুটি গুলি করে। এর একটি বুলেট বিপ্লবের মাথা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে বেরিয়ে যায়। পরে এসআই শফিক দম্ভ করে বলেছে- ‘এবার লাশ নিয়ে যা।’"
শহীদ বিপ্লব হাসানের ব্যক্তিগত তথ্য
বাবুল মিয়া জানান, তার তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে সন্তান বিপ্লব হাসান সবার বড়। সে হাজী মোজাফফর আলী ফকির উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। সকালে তার মায়ের কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়ে নাস্তা খাওয়ার কথা বলে মিছিলে যোগ দেয় বিপ্লব।
ওই দিন ছিল ২০ জুলাই শনিবার। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ছাত্রজনতা ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গৌরীপুরে কলতাপাড়া বাজারে অবস্থান নেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী ও নেতারা। মা বিলকিস আক্তারের কাছ থেকে ৫০ টাকা নিয়ে নাস্তা সেরে সেও এ আন্দোলনে যোগ দেয়। তবে মাকে বলেছিল, নাস্তা সেরেই বাসায় ফিরবে। বাসায় ফিরেছে দু:সাহসিক বিপ্লব নিথর দেহ নিয়ে, অন্যের কাঁধে ভর করে।



