আল-আকসা মসজিদে প্রবেশ নিষেধ, রাস্তায় নামাজ আদায় করছেন ফিলিস্তিনিরা
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদে প্রবেশ করতে পারছেন না হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মুসল্লি। রমজানের শেষ সময়েও তারা মসজিদের ভেতরে যেতে না পেরে আশপাশের রাস্তায় জামাতে নামাজ আদায় করছেন। এই পরিস্থিতি ১৯৬৭ সালের পর প্রথমবারের মতো দেখা যাচ্ছে, যখন আল-আকসা মসজিদ এভাবে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ অভিযানের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতি
বিগত বছরগুলোতে রমজানের এই সময়টায়, বিশেষ করে জুমার নামাজে, লাখো মানুষের ঢল নামত আল-আকসা প্রাঙ্গণে। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। নিরাপত্তার অজুহাতে জেরুজালেমের পুরনো শহর ও পবিত্র স্থানগুলোতে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইসরাইলি বাহিনী।
সব বাধা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিরা তাদের ইমানি দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। আল-আকসা প্রাঙ্গণে ঢুকতে না পেরে অনেকেই নিকটবর্তী বাব আল-সাহিরা গেটের আশপাশে মাদুর বিছিয়ে মাগরিব, এশা ও তারাবির নামাজ আদায় করছেন। পুরনো শহরের বাইরে শত শত মানুষকে জায়নামাজ বিছিয়ে একসঙ্গে নামাজ পড়তে দেখা যাচ্ছে।
মুসল্লিদের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা
৬৫ বছর বয়সী জেরুজালেমের বাসিন্দা ইকরিমা আল-হুসাইনি জানান, গত পাঁচ দশক ধরে তিনি কখনও আল-আকসায় তারাবির নামাজ মিস করেননি। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, 'অর্ধ শতাব্দী ধরে আমি প্রতি রমজানে এখানে আসছি। কিন্তু এ বছরের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। শেষ দশ দিনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমরা হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে ভেতরে থাকতাম। এখন বাইরে নামাজ পড়তে হওয়ায় মনে হচ্ছে, খুব মূল্যবান কিছু আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।'
৪০ বছর বয়সী রামি মোহাম্মদ বলেন, 'মানুষ ভেতরে ঢুকতে না পারলেও যতটা সম্ভব মসজিদের কাছেই থাকতে চায়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার মধ্যে যেমন কষ্ট আছে, তেমনি আল-আকসার প্রতি মানুষের টান ও সংহতিও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।'
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
জেরুজালেম ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ওয়াদি হিলওয়েহ ইনফরমেশন সেন্টার জানিয়েছে, গত বুধবার বাব আল-সাহিরার কাছে নামাজ পড়তে আসা ফিলিস্তিনিদের ওপর চড়াও হয় ইসরাইলি বাহিনী। অনেককে তল্লাশি করা হয়, কয়েকজনকে মারধর করা হয় এবং অনেককে পুরনো শহরে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। কোনো ধরনের বিপদের সাইরেন বা সতর্কতা ছাড়াই এই তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
জর্ডান পরিচালিত পবিত্র আল-আকসা পরিচালনা পরিষদ (ওয়াকফ) জানিয়েছে, রমজানের আগে থেকেই তাদের পাঁচজন কর্মীকে প্রশাসনিকভাবে আটক করেছে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত। পাশাপাশি ৩৮ জন কর্মী এবং ৬ জন ইমামের ওপর মসজিদে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
এদিকে আটটি মুসলিম ও আরব দেশ যৌথভাবে ইসরাইলের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা এটিকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং উপাসনালয়ে অবাধ প্রবেশাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে— ইসরাইলকে এই দমনমূলক নীতি থেকে বিরত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য উত্তেজনা
অন্যদিকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জেরুজালেম গভর্নরেট সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ রমজানের শেষ জুমার নামাজেও আল-আকসা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রমজানের প্রথম জুমায় অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে মাত্র ১০ হাজার মানুষকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে প্রায় পাঁচ লাখ মুসল্লির সমাগম হতো।
এই পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি মুসল্লিরা তাদের ধর্মীয় আচার পালন চালিয়ে যাচ্ছেন, যদিও তা করতে হচ্ছে রাস্তার ওপর। আল-আকসা মসজিদের এই বন্ধ থাকার ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইসরাইলের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করছে।
