আদালত ও হাসপাতালে নারী নির্যাতনের মর্মন্তুদ চিত্র: মামলা বাড়লেও বিচার প্রক্রিয়া জটিল
নারী নির্যাতন মামলা বাড়লেও বিচার প্রক্রিয়া জটিল

আদালত ও হাসপাতালে নারী নির্যাতনের মর্মন্তুদ চিত্র

মানুষের কষ্ট-দুর্ভোগ বুঝতে চাইলে আদালত আর হাসপাতালে আসুন—এই কথাটি মুখে মুখে প্রচলিত হলেও এটি একটি চরম সত্য। ১ মার্চ ঢাকার চারটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল পরিদর্শনের সময় অচেনা মুখগুলোর বিষাদ ও উৎকণ্ঠার ছাপ স্পষ্টভাবে অনুভব করা গিয়েছিল। কক্ষের ভেতরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় বাইরের বারান্দায় পেতে রাখা বেঞ্চে বসে ছিলেন ভুক্তভোগী নারী ও তাঁদের স্বজনেরা। মামলার নম্বর ও নাম ধরে ডাক পড়তেই নারীরা উৎকণ্ঠা নিয়ে বিচারকের সামনে দাঁড়াচ্ছিলেন।

ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য

একটি ট্রাইব্যুনালে মাইক্রোফোন ব্যবহারের কারণে ভুক্তভোগী নারীদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার বর্ণনা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। অন্যদিকে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এ মাইক্রোফোনের অভাবে বাদীদের বিষাদময় কণ্ঠ বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছিল না, শুধু বিচারক ও আইনজীবীর কথোপকথন শোনা গিয়েছিল। পেছনের বেঞ্চে এক তরুণী ডাক পাওয়ার আশায় বসে ছিলেন, যিনি প্রেমিকের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক ধর্ষণের মামলার আবেদন নিয়ে এসেছেন। মানসিক কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাওয়া এই তরুণী কথা বলার এক পর্যায়ে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলেন।

মামলার পরিসংখ্যান ও উদ্বেগজনক প্রবণতা

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত এক বছরে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। গত বছর নারী নির্যাতনের যত মামলা হয়েছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ধর্ষণের অভিযোগের। ২০২৫ সালে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে ২১ হাজার ৯৩৯টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৭ হাজার ৬৮টি মামলা ধর্ষণের অভিযোগের।

দেশজুড়ে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা

ঢাকার আদালতগুলোতে যখন ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে আবেদন নেওয়া ও শুনানি হচ্ছে, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরপর কয়েকটি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার ঘটনা আলোচনায় উঠে এসেছে। পাবনায় দাদিকে হত্যা করে কিশোরী নাতনিকে ফসলের খেতে টেনে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছে। নরসিংদীতে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের শিকার একটি মেয়ের পরিবার বিচার চেয়েছিল স্থানীয়ভাবে, পরে মেয়েটি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। সীতাকুণ্ডে সাত বছরের শিশুকে যৌন সহিংসতার পর গলা কেটে দেওয়া হয়, যিনি দেড় দিন লড়াইয়ের পর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

আইন সংশোধন ও সামাজিক আন্দোলনের তাগিদ

গত বছরের মার্চে মাগুরার আট বছরের শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। আইনে ধর্ষণের মামলার তদন্ত ও বিচারের সময় অর্ধেক করা হয়েছে, তদন্ত হবে ১৫ দিনে এবং বিচার হবে ৯০ দিনে। তবে বিচারক মনে করলে সময় বাড়াতে পারবেন। নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা শুধু সরকারের একার কাজ নয়, এটা সবার দায়িত্ব এবং সম্মিলিত সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

বিচারাধীন মামলার বিশাল সংখ্যা

উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি। ঢাকার ৯টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ১১ হাজার ৫৬৭টি।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক বলেছেন, নারীর ওপর সহিংসতা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরুষের আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে নারীর ওপর সহিংসতা করার তার অধিকার আছে এবং সে পার পেয়ে যাবে। তিনি নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে বড় রকমের সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেছেন, নারী নির্যাতনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, ভুক্তভোগীর আর্থিক, আইনি ও স্বাস্থ্যগত সহায়তা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও প্রত্যাশা

এ পরিস্থিতির মধ্যে প্রত্যাশার স্লোগান নিয়ে ৮ মার্চ রোববার দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার: সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। নারী নির্যাতন মোকাবিলায় আইন সংশোধন, তদন্ত প্রক্রিয়া জোরদার করা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার তাগিদ বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন।