ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমা বন্ধ: সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিনেমা বন্ধ: সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা

বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছে, যেখানে কিছু গোষ্ঠী ঠিক করে দেবে মানুষ কী দেখবে, কী পড়বে, কী শুনবে? ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় 'বনলতা এক্সপ্রেস' চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা সেই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই চলচ্চিত্রে অশালীন বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো উপাদান নেই। এটি একটি সাধারণ বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র, যা দেশের প্রচলিত আইন ও সেন্সর প্রক্রিয়া মেনেই প্রদর্শনের অনুমতি পেয়েছে। তাহলে কোনো অধিকারে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একটি বৈধ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ করে দেয়?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সিনেমার নিয়ন্ত্রণ

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো চলচ্চিত্রের ভালো-মন্দ নির্ধারণ করবেন দর্শক, আইন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু যদি কোনো গোষ্ঠী চাপ সৃষ্টি করে সিনেমা হল বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে আগামীকাল তারা বইমেলা বন্ধ করতে চাইবে, নাটকের মঞ্চ ভেঙে দিতে চাইবে, গান বন্ধ করতে চাইবে, এমনকি মানুষের পোশাক ও জীবনযাপনও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। ইতিহাস বলে, এদের কাছে একবার নতি স্বীকার করলে তার দাবির শেষ থাকে না।

প্রশাসনের নীরবতা হতাশাজনক

আরও হতাশার বিষয় হলো প্রশাসনের নীরবতা। সরকার এবং জেলা প্রশাসন কি এই ঘটনার ব্যাখ্যা দেবে না? একটি বৈধ সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হলো, অথচ দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। এই নীরবতা কি উগ্রবাদীদের আরও উৎসাহিত করবে না?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল মুক্তচিন্তা, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে। এই দেশের মানুষ যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে কোনো গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার জন্য নয়। আমরা এমন বাংলাদেশ চাইনি, যেখানে ভয় দেখিয়ে সিনেমা বন্ধ করা হবে কিংবা শিল্প-সাহিত্যকে সন্দেহের চোখে দেখা হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সমাজে অসহিষ্ণুতার প্রসার

প্রশ্ন উঠতেই পারে আমরা কি ধীরে ধীরে অন্ধকার, অসহিষ্ণু এক সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? আমরা কি এমন এক বাস্তবতার দিকে যাচ্ছি, যেখানে শিল্প ও সংস্কৃতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাই স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে? যদি রাষ্ট্র এই মুহূর্তে দৃঢ় অবস্থান না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি আরও বাড়বে।

সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার

সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানে কেবল একটি সিনেমার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; এটি মানুষের স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন পছন্দ এবং নাগরিক অধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ঘটনা শুধু একটি জেলার ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব স্পষ্ট: আইনের শাসন নিশ্চিত করা, উগ্রবাদী চাপের কাছে আত্মসমর্পণ না করা এবং নাগরিকের সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষা করা। নইলে একদিন দেখা যাবে, সিনেমা হলের পর বইয়ের তাক, নাট্যমঞ্চ, শিল্পকলা একাডেমি সবই মৌলবাদের অঘোষিত সেন্সরের অধীনে চলে গেছে। তখন হয়তো প্রশ্ন করারও সুযোগ থাকবে না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত শনিবার 'বনলতা এক্সপ্রেস' ছবিটির প্রদর্শনী স্থগিত করেছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। আয়োজক কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা আপাতত প্রদর্শনী স্থগিত করেছে। তবে শিগগিরই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষার্থীদের সামাজিক সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি। জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এই সংগঠনের সদস্য। এক বছর ধরে 'ভাতঘুমের সিনেমা আড্ডা' শিরোনামে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে আসছিলেন তাঁরা। সংগঠনটি পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তানিম নূর পরিচালিত চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর আয়োজন করে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার ও গত শুক্রবার জেলার কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীরা সিনেমাটি প্রদর্শন না করার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা পোস্ট করেন।