ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ পুরো দেশ। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলায় চলছে তীব্র আন্দোলন, মানববন্ধন এবং মশাল মিছিল। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে চলেছে। গত ৪৮ ঘণ্টাতেই ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি স্থানে ৯ শিশু যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
রামিসা হত্যাকাণ্ড: বিচারের আশ্বাসেও ক্ষোভ অম্লান
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাটি দেশের পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী সময়ে সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, আগামী এক মাসের মধ্যেই রামিসার খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। রবিবার (২৪ মে) আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ঘটনার দ্রুত বিচারের আশ্বাসেও মানুষের মনের ক্ষোভ কমেনি। সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো সোহেল রানাসহ সব ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
কেন থামছে না এই অপরাধ?
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—দেশজুড়ে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এবং তীব্র সামাজিক প্রতিবাদ চলছে, তখনও অপরাধীরা কীভাবে একের পর এক এই জঘন্য অপরাধ ঘটিয়ে চলেছে? মানবাধিকার সংগঠন, কর্মী এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞরা এই সংকটের পেছনে মূলত ৪টি বিষয়কে দায়ী করেছেন।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সাজার নগণ্য হার
একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত যত ধর্ষণের মামলা হয়েছে, তার মাত্র ৩ শতাংশ মামলার চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন বা সাজা হয়েছে। বাকি ৯৭ শতাংশ মামলাই বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। তদুপরি, এই ৩ শতাংশের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে আসামিরা আইনি ফাঁকফোকর এবং রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবে জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। ফলে অপরাধীদের মনে এই ধারণা গেড়ে বসেছে যে, অপরাধ করলেও পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব।
তদন্তের ধীরগতি ও আলামত সংরক্ষণে গাফিলতি
ধর্ষণের মামলার ক্ষেত্রে প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা মেডিক্যাল টেস্ট ও আলামত সংগ্রহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয় কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপে পড়ে। পুলিশি তদন্তের ধীরগতি এবং ফরেনসিক আলামত সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করার সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত মিরপুরের শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডে ৭ দিনের মধ্যে চার্জশিটের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের তৎপরতায়। এর আগে গত বছর ২০২৫ সালের ৫ মার্চ মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ৩০ দিনের মধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল এবং তার এক মাসের মাথায় আদালত ধর্ষক হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মামলাটি বর্তমানে আপিল পর্যায়ে রয়েছে। তবে আলোচনা না আসা মামলাগুলোর ক্ষেত্রে এমন গতি বা তৎপরতা দেখা যায় না।
বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতার অভাব
দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও মানবাধিকার কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো সাধারণ আদালতের পরিবর্তে বিশেষ ‘দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে’ এনে নির্দিষ্ট ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় মামলা বছরের পর বছর চলায় সাক্ষী হারিয়ে যায়, কিংবা সাক্ষীরা ভয়ভীতি ও প্রলোভনের মুখে বক্তব্য বদলে ফেলেন। ফলে কঠোর আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা দৃশ্যমান হয় না।
মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি ও নৈতিক অবক্ষয়
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর বা তীব্র সামাজিক আন্দোলনের খবর যখন গণমাধ্যমে আসে, বিকৃত মানসিকতার অপরাধীদের ওপর তা সবসময় ভয় তৈরি করে না। উল্টো বিচারহীনতার পরিবেশ দেখে তারা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। সমাজ ও পরিবার পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষার অভাব, মাদকের বিস্তার এবং পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এই মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
বড় সংকট: বিচার ব্যবস্থার ওপর চরম অনাস্থা
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর সাংবাদিকদের সামনে তার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা ক্ষোভ ও আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘আমি বিচার চাই না। কারণ বিচার আপনারা করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনও রেকর্ড নাই।’ এই বক্তব্যের পরই মানুষের মনের ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
আগেও এমন অনেক ভুক্তভোগী পরিবার বিচারহীনতার এই দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে অনাস্থা প্রকাশ করেছিলেন। ২০২১ সালে নোয়াখালীতে গৃহবধূ ধর্ষণ মামলায় ভুক্তভোগীর পরিবার বলেছিল, ‘বিচার পাব কি না জানি না, ভয় নিয়েই বাঁচছি।’ ২০২২ সালে সিলেট এমসি কলেজে গৃহবধূ ধর্ষণ মামলার এক স্বজন বলেছিলেন, ‘দ্রুত বিচার চাই, কিন্তু আগের ঘটনাগুলোর মতো যেন ঝুলে না যায়।’
আগের ঘটনাগুলোতে ভুক্তভোগীদের ভাষা ছিল ‘বিচার পাব না’ বা ‘আস্থা নেই’ ধরনের। কিন্তু রামিসার বাবার বক্তব্যটি সরাসরি রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার ঐতিহাসিক ‘রেকর্ড’ বা সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলেই এটি সমাজকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, অপরাধের পর দ্রুত বিচার না হওয়া এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার কারণে সমাজে এক ধরনের ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে। যা নতুন অপরাধীদের উৎসাহিত করে। রাজনৈতিক বা আর্থিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অপরাধ করলে অনেক সময় তাদের বাঁচাতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব খাটানো হয়। তদন্তে গাফিলতি এবং বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
গত ৪৮ ঘণ্টায় শিশু নির্যাতনের ৯টি ঘটনা
দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠার পরও গত ৪৮ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ৯টি লোমহর্ষক শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামে ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে নগরীর বাকলিয়া, চান্দগাঁও, খুলশি, ডবলমুরিং ও বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় পাঁচ স্থানে ছয় শিশুকে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় লোকজন বিক্ষোভ করেছেন এবং শনিবার পুলিশ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে।
ঢাকার কলাবাগানে শুক্রবার দিবাগত রাতে চকলেট কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ৮ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে প্রতিবেশী এক বৃদ্ধকে (৬০) গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে শাহ পরান ওরফে রাকিব (২৬) নামে এক যুবককে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে র্যাব-১০।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার বক্তাবলীতে ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে হিরো (২২) নামে এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে এলাকাবাসী। এ ঘটনায় অপর এক অভিযুক্তকেও আটক করা হয়েছে।



