যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভার্সাইয়ে এক নৈশভোজ শেষে ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেন, যেখানে হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া এবং ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ছিল। চুক্তি অনুযায়ী ইরান শত শত কোটি ডলারের তেল বিক্রি করতে পারত। ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের জন্য এটি সত্যিই একটি দারুণ চুক্তি’ এবং ইরানের মধ্যস্থতাকারীরা ‘এই চুক্তি নিয়ে গর্বিত’।
চুক্তি ভঙ্গ ও বোমা হামলা
চুক্তির এক মাসের মাথায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তিনটি জাহাজে হামলা হয়, যার জেরে ট্রাম্প তেল বিক্রির জন্য ইরানকে দেওয়া বিশেষ ছাড় বাতিল করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র টানা দুই রাত ইরানের ১৭০টির বেশি সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালায়। দুই পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে একটি বড়, জটিল ও স্থায়ী চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করতে সম্মত হলেও এখনো কোনো আলোচনার সময়সূচি ঠিক হয়নি।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘তারা যদি জাহাজে গুলি চালায়, তবে আমরা তাদের নরক দেখিয়ে ছাড়ব।’ তিনি প্রথমে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার বিরোধিতা করেছিলেন, কিন্তু পরে তাঁকে যুদ্ধের পক্ষে কথা বলার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কৌশলগত অচলাবস্থা
প্রবীণ কূটনীতিক রিচার্ড এন হাস বলেন, ‘আমরা কৌশলগতভাবে এমন এক জায়গায় এসে আটকে গেছি, যেখান থেকে সামনে এগোনোর পথ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যত বেশি হামলা চালাব, ইরানও উপসাগরীয় এলাকার তেল ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে তত বেশি পাল্টা হামলা চালাবে। আর প্রশাসন এখনো বের করতে পারেনি, কীভাবে ওই সব স্থাপনা রক্ষা করা যায়।’
ট্রাম্প প্রথমে ভেবেছিলেন বোমা হামলা চালিয়ে ইরানের সরকার পতন ঘটাবেন, পরে ভাবলেন বোমা মেরে তাদের আত্মসমর্পণ করাতে বাধ্য করবেন—কোনোটিই কাজে আসেনি।
ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার সময় অভ্যন্তরীণ বিভাজন স্পষ্ট হয়। মধ্যস্থতাকারী দলের সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির দিকে পাথর নিক্ষেপ করা হয় এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে নিরাপত্তারক্ষীরা উদ্ধার করে। ট্রাম্প ইরানের সমাজের এই বিভাজন নিয়ে খুব সামান্যই কথা বলেন এবং নতুন নেতৃত্বকে ‘বাজে লোক’ বলেছেন।
পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি
গত জুনের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক জ্বালানির মজুতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। ২০১৫ সালে বারাক ওবামার চুক্তিতে ইরান তাদের মজুতের ৯৭ শতাংশ হস্তান্তর করেছিল, কিন্তু ট্রাম্প ওই চুক্তি থেকে সরে আসেন। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে অস্পষ্টতার কারণে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ইরান জাহাজ চলাচলের ওপর মাশুল আরোপের পরিকল্পনা করছে, যার জেরে মার্কিন নৌবাহিনী ওমানের কাছাকাছি ভিন্ন চ্যানেল ব্যবহার করছে। লয়েডস অব লন্ডনের মতে, এখন ওই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল খুবই কম।
ট্রাম্পের সহযোগীদের দাবি, তাঁরা চুক্তি লঙ্ঘন করেননি; বরং ইরান পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্প আবার এপ্রিলের পরিস্থিতিতে ফিরে গেছেন, যখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সামরিক শক্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ইরানের অনেকে যেকোনো কূটনৈতিক সমাধানকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার আগপর্যন্ত ‘স্থিতাবস্থা’ হিসেবেই দেখে।



