প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের প্রথম চীন সফরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আগামী ২৩ জুন শুরু হতে যাওয়া এই সফরটি কেবল ঢাকা-বেইজিং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
সফরের বিবরণ ও গুরুত্ব
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে বেইজিং যাবেন প্রধানমন্ত্রী। মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক ও একান্ত বৈঠকে অংশ নেবেন। এমন এক সময়ে এই সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্রতর হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশও তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নতুন কূটনৈতিক অংশীদারিত্বের পথ খুঁজছে।
অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প
এই সফরের ঠিক আগেই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার প্রকল্প একনেক সভায় পাস হয়েছে, যা বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সফরে দীর্ঘদিনের আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বড় ধরনের চীনা বিনিয়োগের বিষয়গুলো বিশেষ প্রাধান্য পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ সফিউল্লাহর মতে, এই সফরে তিস্তা প্রকল্পের অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতার বিষয়ে একটি চূড়ান্ত সমাধান বা চুক্তি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, চীনের সঙ্গে বড় ধরনের কৌশলগত সম্পর্কের দিকে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বা ‘হোমওয়ার্ক’ ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা আছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
তবে এই সফরকে ঘিরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোরও বিশেষ নজর রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারত প্রতিযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পশ্চিমাদের সক্রিয়তার কারণে ঢাকার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের পরামর্শ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি এমনভাবে নির্ধারণ করা উচিত যাতে জাতীয় স্বার্থ বজায় থাকে। অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামো এমন যে, সবার সঙ্গেই ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক রাখা জরুরি। কোনো দেশের সঙ্গে বড় চুক্তি করার ক্ষেত্রে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
সফরের সম্ভাব্য ফলাফল
সার্বিকভাবে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর থেকে বাংলাদেশ কতটা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে পারে, তার ওপরই এই সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত কয়েক বছরে অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতে চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে কুনমিং-চট্টগ্রাম সড়ক সংযোগ ও তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে সেই আলোচনাগুলো নতুন গতি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



