প্রথম আলো আয়োজিত ‘সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রা, রুখতে হবে এখনই’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, দালালদের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে জমিজমা বিক্রি করে, ধারকর্জ করে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে বিদেশ যেতে গিয়ে প্রাণ হারান বা আটক হন। এই প্রবণতা রুখতে সরকার, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই।
প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক: অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা উদ্বেগজনক
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এমপি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইউরোপ-অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রঙিন ভবিষ্যৎ ও উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন অনেকে। সমুদ্রপথে বিদেশে যাওয়ার এই চেষ্টা আমাদের রুখতে হবে এখনই।’ তিনি আরও বলেন, ‘দালালদের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে জমিজমা বিক্রি করে, ধারকর্জ করে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে অনেকেই যাত্রা করছেন। কিন্তু এভাবে বিদেশ যাওয়ার সময় অনেকে প্রায়ই ভয়াবহ ঘটনার শিকার হন। দালালেরা তাঁদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করেন। যাত্রাপথে তাঁদের ন্যূনতম খাবার কিংবা পানি পর্যন্ত দেওয়া হয় না। অনেকে মাঝপথে মারা যান। যাঁরা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের তীরে ভিড়তে পারেন, সে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হন।’
প্রতিমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও জোরালো ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘এই সংকট এখন আমাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।’ বিদেশগামীদের জন্য দেশে ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এগুলোর মান বাড়ানোর জন্য কাজ করছি।’ সমুদ্রপথে বিদেশযাত্রা বন্ধে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি সচেতনতামূলক কাজে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক আ. মান্নান: মানব পাচারের তথ্য স্বীকার করতে চায় না পরিবার
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘সাগরপথে বিদেশযাত্রার বিষয়টি নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটি অনেক বেশি আলোচনায় এসেছে। কক্সবাজার উপকূলে শীতকালে সমুদ্র শান্ত থাকায় এ সময় মানব পাচারের ঝুঁকিও বাড়ে।’ তিনি জানান, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য পেলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু একটি বড় সমস্যা হলো, যেসব পরিবার তাদের সদস্যদের সমুদ্রপথে বিদেশ যেতে গিয়ে হারায় বা প্রতারণার শিকার হয়, তারা অনেক সময় ঘটনাটি স্বীকারই করতে চায় না। ফলে এই অপরাধের তদন্ত ও অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতিও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বিষয়টিকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দিয়ে মানুষকে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। সরকারি প্রশিক্ষণকেন্দ্র, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।’
কোস্টগার্ড: ৭১০ কিলোমিটার উপকূলরেখায় নজরদারির সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের পূর্ব জোন-চট্টগ্রামের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘কোস্টগার্ড সমুদ্রপথে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান ঠেকাতে নিরলসভাবে কাজ করছে। সংঘবদ্ধ এই অপরাধ ঠেকাতে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গণমাধ্যম ও সচেতন মানুষের মধ্যে তথ্য বিনিময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি জানান, পাচারকারীরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এনে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে আসে এবং পরে রাতের অন্ধকারে সমুদ্রপথে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করে। নৌকায় করে পাচারের সময় নারী ও শিশুদের পরিস্থিতি অত্যন্ত মানবেতর হয়। খাবার, বিশুদ্ধ পানি কিংবা শৌচাগারের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। অনেক সময় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে এবং মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের উপকূলরেখা ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ। যেকোনো স্থান দিয়েই নৌকা নামানো সম্ভব। কিন্তু উপকূলে পর্যাপ্ত নজরদারি ব্যবস্থা, হেলিকপ্টার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা জেল থেকে বেরিয়ে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান: সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ গুরুত্বপূর্ণ
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, ‘দালালের প্রলোভনে পড়ে মানব পাচারের শিকার হন মূলত সমাজের সেই মানুষরা, যাঁরা বঞ্চিত, নিগৃহীত ও হতাশ। এই মানুষদের বাস্তবতা চিহ্নিত না করে শুধু আইন প্রয়োগ করে মানব পাচার বা অনিরাপদ অভিবাসন বন্ধ করা সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে ক্ষেত্রে সমস্যাটা আরও জটিল। এখানে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার আশ্রয় নেওয়া এবং উপকূলীয় ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পাচারকারীরা সহজেই মানুষকে প্রলুব্ধ করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলে অনেককে ফাঁদে ফেলা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের চিন্তা ও মানসিকতার পরিবর্তন না এলে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এই সমস্যা মোকাবিলা করা কঠিন। পিছিয়ে পড়া মানুষদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
রোহিঙ্গা সংকট ও সমুদ্রপথে যাত্রা
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের উপসচিব ও ক্যাম্প ইনচার্জ সুরাইয়া আক্তার সুইটি বলেন, ‘২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে নিজ দেশে ফিরে নাগরিক হিসেবে স্বাভাবিক জীবন পাওয়ার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে তাদের। এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও হতাশার কারণে অনেকেই জীবন বাজি রেখে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া বা অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরগুলোতে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে।’
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, ‘২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সমুদ্রপথে মানব পাচার এবং থাইল্যান্ড–মালয়েশিয়া সীমান্তে গণকবরের ঘটনা নিয়ে আমি প্রতিবেদন করেছি। বিশ্বের অল্প কয়েকজন সাংবাদিকের একজন হিসেবে আমি সেই গণকবর দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে কবরগুলোর ওপর কোনো নাম ছিল না, ছিল শুধু নম্বর।’ তিনি জানান, সে সময় প্রায় এক লাখ মানুষ পাচারের শিকার হয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ বৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিদেশে বৈধভাবে কাজ করছেন এবং গত বছর তাঁরা ৩২ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। তারপরও অনেক মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন।
ইউএনএইচসিআরের সহকারী প্রতিনিধি (সুরক্ষা) আস্ট্রিড ক্যাসেলিন বলেন, ‘শুধু ২০২৩ সালে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশযাত্রার সময় প্রায় ৫ হাজার ৭৮৭ জন মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ নারী ও শিশু। ইউএনএইচসিআর তথ্য অনুযায়ী, এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ৩৯ শতাংশ নারী এবং ৫০ শতাংশ শিশু। নিখোঁজ ব্যক্তিদের অর্ধেক রোহিঙ্গা এবং অর্ধেক বাংলাদেশি নাগরিক।’
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য
ভুক্তভোগী তারেকুর রহমান জানান, ‘সহজে মালয়েশিয়ার ভিসা পাওয়া যাবে, এই প্রলোভন দেখিয়ে দালাল আমাদের মহেশখালী থেকে মিয়ানমারে পাচার করে দেয়, যেখানে পৌঁছানোর পর থেকেই আমাদের ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। প্রথমে নির্মম মারধর করে পরিবার থেকে এক লাখ টাকা নিয়ে আমাদের অন্য একটি গোপন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে আমাদের নির্যাতন করা হতো, আমাদের জীবননাশের হুমকি দেওয়া হতো।’ আরেক ভুক্তভোগী অং অং উ জুয়েল বলেন, ‘মালয়েশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া যেতে চেয়েছিলাম। বৈধভাবে যাওয়ার জন্য যে ভাষার পরীক্ষা দিতে হয়, সেগুলোর খরচ বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। দালালেরা সহজ পথে, কম খরচে পাঠানোর আশ্বাস দেওয়ায় স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করি। পরে বুঝতে পারি, আমরা মিয়ানমারে ঢুকে পড়েছি।’
সুপারিশ
গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা বেশ কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করেন। সেগুলো হলো: ১. মানব পাচারের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ২. তৃণমূল পর্যায়ে সারা দেশে অভিবাসন ও মানব পাচারবিষয়ক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা। ৩. মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে অভিবাসন এবং মানব পাচার বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। ৪. ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। ৫. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সীমান্ত ও উপকূল রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির সরঞ্জাম ও জনবল দিয়ে শক্তিশালী করা। ৬. বিভাগীয় শহরগুলোর পাশাপাশি পাচারপ্রবণ জেলাগুলোয় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা।



