দেশের বিভিন্ন স্থানে আরবি হরফে ইসলাম ধর্মের কালেমা-খচিত সাদা-কালো পতাকা নিয়ে মিছিল, শোভাযাত্রা ও প্রকাশ্যে প্রদর্শনের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কূটনীতিক, নিরাপত্তা, উগ্রবাদ ও অভিবাসন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশের অনেক মানুষের কাছে এটি ধর্মীয় আবেগের প্রকাশ হলেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর ভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশ, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে এটি নিরাপত্তা-উদ্বেগ বা উগ্রবাদী প্রতীকের বিস্তার হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য দ্রুত যাচাই করে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি সরাসরি শ্রম অভিবাসনের ওপর প্রভাব ফেলবে, এমন আশঙ্কা এখনই বড় করে দেখার সুযোগ নেই। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, এটি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সাময়িক প্রবণতা নাকি কোনো সংগঠিত গোষ্ঠীর কৌশল; তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, কালেমা মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তাই এ বিষয়ে রাষ্ট্রের যে কোনো পদক্ষেপ হতে হবে সংযত, ব্যাখ্যামূলক ও দায়িত্বশীল। আবার কেউ মনে করছেন, বিশ্বজুড়ে কিছু উগ্রবাদী সংগঠন সাদা-কালো কালেমা-খচিত পতাকার বিভিন্ন রূপ ব্যবহার করায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর একটি নেতিবাচক প্রতীকী বার্তা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশে এই ধরনের পতাকার ব্যবহার বাড়লে, বিশেষ করে তা মিছিল বা রাজনৈতিক আবহে দেখা গেলে, দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক কূটনীতিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনো পতাকায় কালেমা বা আরবি লেখা থাকুক বা না থাকুক, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এর মাধ্যমে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে। যদি এর আড়ালে উগ্রবাদী শক্তির উত্থান বা তৎপরতার বিষয় থাকে, তাহলে তা মোকাবিলা করা সরকারের দায়িত্ব। তবে যদি এটি কেবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে পরিচালিত কোনো প্রচারণা বা সাময়িক ক্যাম্পেইন হয়, তাহলে সরকারের ভিন্নভাবে বিষয়টি সমাধান করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে বিষয়টির যৌক্তিক ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে তুলে ধরা। তবে তার আগে এ ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, সেটি খুঁজে বের করাই সবচেয়ে জরুরি।’
সাবেক এই কূটনীতিকের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো দৃশ্য বা প্রতীকের ব্যাখ্যা শুধু স্থানীয় আবেগের ভিত্তিতে হয় না। বিদেশি কূটনীতিক, বিনিয়োগকারী বা নীতিনির্ধারকরা ঘটনাটির প্রেক্ষাপট, আয়োজক, স্লোগান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া—সবকিছু মিলিয়ে মূল্যায়ন করেন। তাই বিষয়টি অতিরঞ্জিত না করে, আবার অবহেলাও না করে, বাস্তবতা যাচাই করে রাষ্ট্রীয় অবস্থান পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
শ্রম অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি
শ্রমবাজারের বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রশ্নকে আলাদা করে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন অভিবাসন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির চাহিদা মূলত অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারভিত্তিক। কিন্তু পশ্চিমা দেশ, উন্নয়ন সহযোগী, বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিষয়টিকে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে ঘটনাটি যদি আন্তর্জাতিক প্রচারণায় নেতিবাচকভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা মোকাবিলায় রাষ্ট্রের প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে যান। এছাড়া মালয়েশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে কর্মসংস্থানের জন্য যান তারা। যেখানে শ্রমশক্তির চাহিদা রয়েছে, সেখানেই তারা কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, কালেমা-খচিত পতাকা ব্যবহারের সঙ্গে শ্রম অভিবাসনের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে পশ্চিমা দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে এর কিছু প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন আসিফ মুনির। তিনি বলেন, ‘এটা সরকারকে দেখতে হবে, কারণ খুঁজতে হবে, আসলে এর উদ্দেশ্য কী। এটা বিশ্বকাপ-কেন্দ্রিক একটি ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে। যা সাময়িক ঘটনা বলেই মনে হয়। অন্তত অভিবাসনের সঙ্গে এই কালেমা-খচিত পতাকার সম্পর্ক আমি দেখছি না।’
উগ্রবাদী সংগঠনের প্রসঙ্গ
দেশে কালেমা-খচিত সাদা-কালো পতাকার সাম্প্রতিক ব্যবহার নিয়ে জানতে চাইলে উগ্রবাদ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কালেমা-খচিত সাদা-কালো পতাকাটি যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তাতে মানুষের মনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো এই পতাকা ব্যবহার করে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আল-কায়েদা, আইএস, বোকো হারামসহ বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠন এ ধরনের পতাকা ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশেও হিযবুত তাহরীর, হরকাতুল জিহাদ ও জেএমবিসহ কয়েকটি উগ্রবাদী সংগঠনের হাতে এই পতাকা দেখা গেছে। পাশাপাশি দেশের কিছু ইসলামী সংগঠনও বিভিন্ন সময়ে এটি ব্যবহার করেছে।
নূর খান লিটন বলেন, ‘শুক্রবার (৩ জুলাই) জুমার নামাজের পর গুলিস্তান থেকে বাইতুল মোকাররম পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর পতাকা বাঁশে টাঙিয়ে বিক্রি হতে দেখেছি। একই সঙ্গে একটি বাঁশের মাথায় কালেমা-খচিত একটি পতাকাও বিক্রির জন্য রাখা ছিল। এতে মনে হয়েছে, এখন সাধারণ মানুষও এটি ব্যবহার করতে শুরু করেছে। তবে এই পর্যায়ে এর ব্যবহার নিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন উগ্র গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে তৎপরতা চালিয়েছে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী যেভাবে এই পতাকা ব্যবহৃত হয়েছে এবং এখন বাংলাদেশেও যেভাবে এর ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তাতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ তৈরি হতে পারে।’
নূর খান লিটনের মতে, বিষয়টি নিয়ে সরকার ও সমাজ—উভয় পর্যায়ে স্পষ্ট আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। বর্তমানে বিশ্ব ফুটবল উপলক্ষে অন্যান্য দেশের পতাকার সঙ্গে এই পতাকাও বিক্রি হচ্ছে। অনেক মানুষ হয়তো না বুঝেই, শুধু কালেমা লেখা দেখে ধর্মীয় শ্রদ্ধাবোধ থেকে এটি ব্যবহার করছেন। কিন্তু এর পেছনের প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হবে। মূলত এই পতাকাকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তারা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে নূর খান লিটন বলেন, ‘এ ধরনের দৃশ্য বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ভুল বার্তা তৈরি করতে পারে। তাই বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করে সরকার ও সমাজকে দায়িত্বশীলভাবে এটি মোকাবিলা করতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে যে কালেমার বিষয়ে কোনো আপসের প্রশ্ন নেই। কিন্তু বিশ্বব্যাপী কিছু উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী এই পতাকাকে যেভাবে ব্যবহার করেছে, সে কারণে এটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সেই বাস্তবতাও মানুষের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান বজায় রেখেই ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ দূর করা যায়।’
বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধর্মীয় আবেগ বা অন্য যেভাবেই বিবেচিত হোক, কালেমা-খচিত সাদা-কালো পতাকা মিছিলকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘ পরিক্রমায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও গভর্ন্যান্স ইকোসিস্টেমে ধর্মকে, বিশেষ করে ধর্মীয় অপব্যাখ্যাকে, যেভাবে সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে বিনিয়োগের অন্যতম উপাদান হিসেবে বিকশিত হতে দেওয়া হয়েছে, এটি তারই একটি বহিঃপ্রকাশ।’
তিনি বলেন, ‘এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে বা বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব পড়বে এবং তা কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক হবে, তা নিরূপণের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। বরং তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি বহু-ধর্মী, বহু-জাতি, বহু-গোষ্ঠী, বহু-সংস্কৃতি, বহু-ভাষাভিত্তিক ও সমঅধিকারনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কী হবে, তা জাতীয়ভাবে নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতামত
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সাবেক প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহফুজুর রহমান (অব.) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সমাজে উগ্র মতাদর্শের প্রতি তেমন কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। এমনকি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও সমাজ তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল। কালেমা-খচিত সাদা-কালো পতাকার বিষয়টিকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি বড় করে দেখা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের দুটি বিষয় বিবেচনা করা উচিত। প্রথমত, কোন কোন দেশ এ নিয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং কী ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি করছে। দ্বিতীয়ত, ঢাকা যখন তার কৌশলগত বিকল্প ও পররাষ্ট্রনীতিকে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে, তখন বাংলাদেশকে বিতর্কিত বা অগ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপনের জন্য এটি কোনো “ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন” কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এমনও হতে পারে, অতি-ডানপন্থি (আল্ট্রা-রাইট) উদ্দেশ্যসম্পন্ন কোনো ছোট গোষ্ঠী এসব করছে।’
এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘সরকারের উচিত দ্রুত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সক্রিয় করে বিষয়টি তদন্ত করা এবং এটি বাংলাদেশবিরোধী কোনো প্রচারণায় রূপ নেওয়ার আগেই গণমাধ্যমের সামনে প্রকৃত তথ্য স্পষ্ট করা। এ কথাও মনে রাখা দরকার, ছোট দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাধারণত তিনটি বিষয় সামনে আনা হয়—অস্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং গণতান্ত্রিক ঘাটতির অভিযোগ। বাংলাদেশ যত বেশি কৌশলগত স্বাধীনতার পথে এগোবে, ততই এ ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।’



